Sunday, May 16, 2010

লে. জে. এ এ নিয়াজির একটি দুর্লভ সাক্ষাতকার



(১৯৭১ সালে পাকিস্তানের পরাজয়ের কারন অনুসন্ধানে গঠিত হামূদুর রহমান কমিশনের আংশিক রিপোর্ট পাকিস্তানে ২০০১ সালে সরকারিভাবে প্রকাশিত হয় (এই সম্পর্কিত আমার পূর্বের পোস্টটি দেখুন)।এটি প্রকাশিত হবার পর থেকেই পাকিস্তানের অভ্যন্তরে ১৯৭১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে সংগঠিত যুদ্ধাপরাধ ও গনহত্যা ও পাকিস্তানের ভাঙনের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনার জন্য জন-সাধারনের চাপ বাড়তে থাকে। এরই প্রেক্ষিতে ১৯৭১ সালে যুদ্ধের সময় তৎকালীন পাকিস্তান ইস্টার্ন কমান্ডের কমান্ডার, লেফটেনান্ট জেনারেল আমীর আব্দুল্লাহ খান নিয়াজি ২০০১ সালের ডিসেম্বর মাসে rediff.com এর মালিকানাধীন সর্বাধিক প্রচারিত ইন্দো-আমেরিকান সংবাদপত্র India Abroad এ একটি সাক্ষাতকার দিয়েছিলেন।এখানে তিনি অনেক স্পর্শকাতর কথাই অকপটে স্বীকার করেন, অনেক গোপন তথ্য প্রকাশ করেন, আবার তাকে বা তার অধীন ইস্টার্ন কমান্ডের প্রতি তোলা অভিযোগগুলো কৌশলে এড়িয়ে যান।এই সাক্ষাতকারটি পরবর্তীতে তিনি মারা যাওয়ার একদিন পর ০২ ফেব্রুয়ারি ২০০৪ তারিখে rediff.com তাদের আন্তর্জালের পাতায় পুনরায় প্রকাশ করে।বর্তমান সময়ে আমাদের দেশে যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য নতুনভাবে উদ্যোগ শুরু হওয়ায়, প্রাসঙ্গিক বিবেচনা করে দুর্লভ এই ইংরেজী সাক্ষাতকারটি বাংলায় অনুবাদ করে আপনাদের সামনে উপস্থাপন করলাম।)

১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে ভারতীয় সেনাবাহিনী দুই সপ্তাহেরও কম সময়ে উপুর্যপরি,হতচকিত আক্রমণ ও অগ্রাভিযানের মাধ্যমে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পতন ঘটায় এবং বাংলাদেশকে মুক্ত করে।ভারতের এই অন্যতম ক্ষিপ্রতর ও উজ্জ্বলতম সেনা অভিযান শুধু পাকিস্তানকে ভাঙেনি, পাশাপাশি দেশটিকে উপহার দি্যেছিল এক চিরস্থায়ী লজ্জা।

পশ্চিম পাকিস্তান সেনাবাহিনী পূর্ব পাকিস্তানের বৃহত্তম বাংলাভাষীদের উপর দমন অভিযান শুরু করে যারা অধিকতর স্বায়ত্বশাসন চাইছিল, এর ফলে সৃষ্ট গৃহযুদ্ধের কারনে সামরিক অভিযানের ভয়ে পূর্ব থেকে পলায়নপর ১০ মিলিয়ন বাঙ্গালি শরণার্থীকে ভারতবর্ষ আশ্রয় দিতে বাধ্য হয়েছিল।পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া খান জম্মু ও পাঞ্জাবে অবস্থিত ভারতীয় বিমান ঘাঁটিতে আক্রমণের নির্দেশ দিলে উত্তেজনা চরমে পৌছায়।এর সমুচিত জবাব দিতে ৩ ডিসেম্বর মধ্যরাতে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী পাকিস্তানের বিরূদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করেন।

১৩ দিন পরে লেফটেনান্ট জেনারেল আমীর আব্দুল্লাহ খান নিয়াজির নেতৃত্ত্বাধীন পাকিস্তান সেনাবাহিনী আত্নসমর্পন করে।পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের দায়িত্ব জেনারেল নিয়াজির অধীনে থাকায়, যুদ্ধে পরাজয়ের জন্য তাকে দায়ী করা হয় এবং ১৯৭৫ সালে তাকে সেনাবাহিনী থেকে অপসারন করা হয়।যুদ্ধ শেষ হলে পাকিস্তানে যে হামূদুর রহমান তদন্ত কমিশন গঠিত হয়, তার আংশিক রিপোর্ট সরকারীভাবে ২০০১ সালে প্রকাশিত হয়। এই রিপোর্টে যদিও জেনারেল নিয়াজির কোর্ট-মার্শাল হওয়া উচিত বলে সুপারিশ করা হয়, অবশ্য তাকে কোনো ধরণের বিচারের মুখোমুখি হতে হয় নি।

তিন দশক পরে, অসুস্থ, ৮৬ বছর বয়সী জেনারেল নিয়াজি নিজেকে নির্দোষ প্রমানের জন্য স্বেচ্ছায় কোর্টমার্শালে বিচারের মুখোমুখি হতে চেয়েছিলেন।

তৎকালীন ভারতবর্ষের পাঞ্জাব প্রদেশের মিয়ানওয়ালির নিকট বালো-খেল গ্রামে ১৯১৫ সালে জন্ম নেওয়া জেনারেল নিয়াজি সামরিক বাহিনীতে কর্মরত অবস্থায় ২৪টি মেডেল পেয়েছিলেন।তিনি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কমান্ডের নেতৃত্ত্বে ছিলনঃ ১৯৬৫ সালে ভারতের বিরূদ্ধে যুদ্ধে ৫ পাঞ্জাব, পাকিস্তান কর্তৃক কাশ্মির ও সিয়ালকোট দখল অভিযানের সময় ১৪ প্যারা ব্রিগেড।তিনি করাচি ও লাহোরের সামরিক প্রশাসক ছিলেন।

জেনারেল নিয়াজি যিনি গত সোমবার মারা গিয়েছেন, ২০০১ সালের ডিসেম্বর মাসে rediff.com এর মালিকানাধীন সর্বাধিক প্রচারিত ইন্দো-আমেরিকান সংবাদপত্র India Abroad এ একটি সাক্ষাতকার দিয়েছিলেন। এই দুর্লভ সাক্ষাতকারটি নিয়েছিলেন আমির মির।

হামুদূর কমিশন রিপোর্ট প্রকাশ হবার পর নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে, রিপোর্টের সুপারিশ যা জন-সাধারণের সমর্থ্ন পাচ্ছে, ১৯৭১ সালের পরাজয়ের জন্য যে সব সামরিক অফিসার দায়ী তাদের বিরূদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। এ ব্যাপারে আপনার প্রতিকৃয়া কী?


আমি জন-সাধারণের দাবীকে সমর্থন জানিয়ে বলছি, যারা বিশেষ করে সামরিক বাহিনীর যেসব সদস্য পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্কটের জন্য দায়ী, তাদের শাস্তি পাওয়া উচিত।পরাজয়ের পর পাকিস্তানে ফিরে আমি স্বেচ্ছায় কোর্ট-মার্শাল প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে চেয়েছিলাম।কিন্তু সেসময়ের সেনাবাহিনী প্রধান টিক্কা খান আমার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।সে প্যান্ডোরার বাক্স খুলতে চায় নি।এই ধরনের কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হলে যুদ্ধ পরিচালনায় জেনারেল হেডকোয়্যাটারের অযোগ্যতা ও রিজার্ভ সেনাবাহিনী্র কমান্ডার হিসেবে টিক্কার ভূমিকা প্রকাশ হয়ে যেত।সত্য বলতে কি, হামুদূর রহমান কমিশনের সামনে আমাদের আত্ন-রক্ষার অধিকারকে অস্বীকার করা হয়েছিল, কিন্তু কোর্ট-মার্শালের সময় এটা অস্বীকার করা যায় না।

পাকিস্তান আর্মি অ্যাক্ট অনুসারে আপনি আপনার স্বপক্ষে এক জন প্রত্যক্ষদর্শীকে জেরা করতে পারেন, ডাকতে পারেন, বিশেষ করে যখন আপনার চরিত্র ও সম্মান ঝুঁকির মধ্যে থাকে।এই ধরনের সুযোগ জেনারেল হেডকোয়্যাটারের(GHQ) দুর্বলতাকেই প্রকাশ করে দেয়, তাই আমাদের কখনই কোর্ট-মার্শাল হবে না।যদি কখনও কোর্ট-মার্শাল হয়ও, আমি সহজেই অভিযোগ থেকে মুক্তি পাবো।কমিশন আমার এই যুক্তির প্রতি সম্মতি প্রকাশ করেছে যে, রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া খান কর্তৃক আমাকে আত্ন-সমর্পণ করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

আপনি বলেছেন, কমিশন আপনার এই যুক্তির প্রতি সম্মতি প্রকাশ করেছে যে, রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া খান কর্তৃক আপনাকে আত্ন-সমর্পণ করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।কিন্তু মোশারফের সময়ে প্রকাশিত রিপোর্টে এই পরাজয়ের জন্য আপনিসহ কয়েকজন জেনারেলকে দায়ী করা হয়েছে?

যদি আমি এই বড় বিয়োগান্তক ঘটনার জন্য দায়ী হই, কেন আমার কোর্ট-মার্শাল হল না, যদিও টিক্কা আমাকে ক্ষতি করতে চেষ্টা করেছিল?সেনাবাহিনীর প্রধান হয়েই টিক্কা, কাসুরে আমার জন্য বরাদ্দকৃত সীমান্তে দুইটি স্কয়ার(ব্যরাক) বাতিল করে দেয়।১৯৯১ সালের জানুয়ারিতে এক ইংরেজি দৈনিকে প্রকাশিত বিবৃতিতে টিক্কা বলেছিলেন, “আমরা লে. জে. এ এ কে নিয়াজির বিরূদ্ধে এমনকি কোনো সম্ভাব্য উপাদান খুঁজে পাই নি যিনি ভারতীয় কমান্ডার লে. জে. জগোজিৎ সিং অরোরার কাছে আত্ন-সমর্পন করেছিলেন, কারন তিনি আত্নসমর্পনের জন্য ইয়াহিয়া খানের কাছে থেকে অনুমতি পেয়েছিলেন।কিন্তু আমরা তাকে সেনাবাহিনীতে আর ফিরিয়ে নেই নি এবং সকল স্বাভাবিক সুবিধাদিসহ নির্বাহি আদেশে তাকে অবসর দেওয়া হয়।”

আপনি কি বলতে চাচ্ছেন ঢাকার পতনের জন্য রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া খান এককভাবে দায়ী এবং আপনি শুধু তার নির্দেশ অনুসরন করেছেন?

না। ইয়াহিয়া খান ছাড়াও পূর্ব পাকিস্তান সঙ্কটের জন্য আরো কয়েকজন জন ব্যক্তিবর্গ সমানভাবে দায়ী ছিল যাদেরকে রিপোর্টে দায়ী করা হয় নি।কমিশন কিছু ব্যক্তি বা ফ্যাক্টর সম্পর্কে প্রকৃত সত্যের জট খুলতে পারে নি, যা পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্নতা আন্দোলনকে শক্তি যুগিয়েছে এবং যা জিন্নাহর অখন্ড পাকিস্তানের চূড়ান্ত ভাঙনের কারন।

রিপোর্টটিতে উপসংহার টানা হয়েছে এই বলে, আত্ন-সমর্পনের জন্য কোনো নির্দেশ ছিল না।যদিও আপনার অঙ্কিত (ইস্টার্ন কমান্ডের কমান্ডার হয়ে) “আপনার দৃষ্টিতে নিদারুণ হতাশার বেপরোয়া চিত্রে”, উর্ধতন কর্তৃপক্ষ শুধুমাত্র তখনই আপনাকে আত্নসমর্পন করার অনুমতি দিয়েছিলেন, যদি প্রয়োজন হয়।রিপোর্ট বলছে, আপনি সেই নির্দেশ অমান্য করতে পারতেন, যদি আপনি মনে করতেন আপনি ঢাকাকে রক্ষা করতে পারবেন।


আমি শপথ করে বলতে পারি, ইয়াহিয়ার কাছে থেকে আমাকে পরিষ্কার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল আত্ন-সমর্পনের জন্য, কিন্তু আমি তখনও শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যেতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলাম।এমনকি আমি সংবাদও পাঠিয়েছিলাম, আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চাই।তথাপি, জেনারেল আব্দুল হামিদ খান এবং এয়ার চীফ মার্শাল রহিম আমাকে টেলিফোন করে নির্দেশ দেন, ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ জেনারেল হেড কোয়্যাটার(JHQ) থেকে যে সংকেত(Signal) এসেছে, সেই অনুযায়ী কার্য সম্পাদন করি, কারন পশ্চিম পাকিস্তান তখন বিপদাপন্ন ছিল।এই সময় আমাকে নির্দেশ দেওয়া হয় অস্ত্র-বিরতিতে রাজী হওয়ার জন্য, যেন সৈন্যদলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।

কমিশন প্রমান পেয়েছে, আপনার সৈন্যদল পূর্ব পাকিস্তানে লুট, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ ও হত্যায় জড়িত ছিল, এই ব্যাপারে আপনি কি বলবেন?

পূর্ব পাকিস্তানের কমান্ড হাতে নেওয়ার পর পরই আমার কাছে সৈন্যদল সম্পর্কে অসংখ্য রিপোর্ট আসতে শুরু করে, এরা বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্নভাবে অকারনেই লুট, অগ্নিসংযোগ, হত্যায় জড়িত হয়ে পরছে, যা আমার কাছে পরিষ্কারভাবে রাষ্ট্রবিরোধী কার্যক্রম বলে মনে হয়েছে।পরিস্থিতির গভীরতা অনুভব করে, ১৫ এপ্রিল ১৯৭১ সালে চিঠির মাধ্যমে আমার উর্ধতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষনের চেষ্টা করি, যে বিশৃঙ্খল অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে তা উল্লেখ করি।আমি পরিষ্কারভাবে লিখে জানাই, অনেকগুলো ধর্ষনের রিপোর্ট পাওয়া গেছে, এমনকি পশ্চিম পাকিস্তানিরাও এ কর্মকান্ড থেকে মুক্ত নন।আমি আমার উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে জানাই, অফিসাররাও এই ধরনের ঘৃণ্যকাজে জড়িত বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।

তথাপি, বার বার সতর্কবানী ও নির্দেশনা সত্ত্বেও, স্ব স্ব কমান্ডারগন এই বিশৃঙ্খল অবস্থার লাগাম টেনে ধরতে ব্যর্থ হন। এই প্রবণতা নিশ্চিতভাবেই আমাদের সৈন্যদলের যুদ্ধ করার দক্ষতাকে হ্রাস করে দেয়।

একজন মিলিটারি কমান্ডার হিসেবে আপনার ব্যর্থতাকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করবেন এবং পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এই অপমানজনক আত্ন-সমর্পনের দায়-দায়িত্ব আপনি কি নেবেন?


আমাদের ৪৫,০০০ ট্রুপ্(সৈন্যদল) লড়েছিল ভারতের আধা মিলিয়ন ট্রুপ, লাখ লাখ মুক্তি মুক্তিবাহিনী (বাঙালি মুক্তিযোদ্ধা যারা ভারতের সমর্থনপুষ্ট ছিল) এবং সর্বপরি বৈরী এক বাঙালি জাতির বিরুদ্ধে।প্রকৃতপক্ষে এই বিদ্রোহ দমনের জন্য আমাদের প্রায় ৩০০,০০০ ট্রুপের প্র্য়োজন ছিল।তখন আমরা ইতঃপূর্বে মূল ঘাঁটি থেকে বিচ্ছিন হয়ে পড়েছিলাম, তারপরেও বিরতিহীনভাবে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিলাম।

যদি হামূদ মনে করে থাকেন আমরা বন-ভোজনে গিয়েছিলাম, তাঁর আমাদের সাথে যোগ দেওয়া উচিত ছিল।আমি স্পষ্ট বলতে চাই, পূর্ব পাকিস্তানে আমার অধীনস্ত সেনাবাহিনী সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করেছে।প্রকৃতপক্ষে এটা ছিল এক অদম্য ক্ষমতার লড়াই যা ১৯৭১ সালে এই সঙ্কট তৈরী করেছিল, বিশেষকরে যখন বন্দুকের নল ক্ষমতা হস্তান্তরের পথকে রুদ্ধ করে দিয়েছিল।

১৯৭১ সালের এই সঙ্কট ছিল ইয়াহিয়া, মুজিব (আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা, শেখ মুজিবুর রহমান) এবং ভুট্টোর (পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, জুলফিকার আলী ভুট্টো) মধ্যে চলা অদম্য ক্ষমতার লড়াইয়ের ফল।ইয়াহিয়া চেয়েছিল ক্ষমতা ধরে রাখতে আর ভুট্টো চেয়েছিল ক্ষমতায় বসতে।শেখ মুজিবের আওয়ামী লীগ স্পষ্ট বিজয় অর্জন করেছিল, সরকারের উচিত ছিল তাঁর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা।ভুট্টোর অগ্নিগর্ভ বক্তৃতা বাগাড়ম্ভর ছাড়া কিছুই ছিল না, তিনি যে কোনো মূল্যে ক্ষমতায় যেতে বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল।যদি মুজিবের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হত, তবে পাকিস্তান অখন্ড থাকত।এটা খুব দুঃখজনক, কমিশন ভুট্টোকে সব ধরনের দায় থেকে অব্যাহতি দিয়েছে।

১৯৭১ সালের সঙ্কটের জন্য দায়ী জেনারেলদের জন-সম্মুখে বিচারের জন্য কমিশন সুপারিশ করেছিল।জেনারেল টিক্কা, সাহিবজাদা ইয়াকূব আলী খান(ইস্টার্ন কমান্ডের সাবেক কমান্ডার) এবং রাও ফরমান আলীকে(নিয়াজির উপদেষ্টা) অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল। তারা কি নিরপরাধ ছিল?

কমিশনের রিপোর্টে এভাবে এই তিন জনকে অব্যাহতি দেওয়ার বিষয়টিতে আমি একমত হতে পারছি না।এটা খুবই আশ্চর্যজনক ব্যপার, পাকিস্তান ভাঙার জন্য টিক্কা, ইয়াকূব এবং ফরমানকে দায়ী করা হয় নি।প্রকৃতপক্ষে ইস্টার্ন কমান্ডের কমান্ডার হিসেবে ইয়াকূবের নিষ্ক্রিয়তাই পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতিকে অগ্নিগর্ভ করে তুলেছিল।ইয়াকূব প্রত্যকটি ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা তৈরী করে তাঁর দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করে পালিয়েছিলেন, অথচ তাঁর এই নীতি বিবর্জিত কাজগুলোকে গোপন করা হয়েছে।জাতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করার জন্য তাঁকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝোলানো উচিত।ইয়াহিয়া তাঁর পদ-মর্যাদা অবনমন করেছিলেন।পরবর্তীতে ভুট্টো তার পদ-মর্যাদা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে এনে মার্কিন যুক্ত্রাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত করেন।সেনাবাহিনীর দায়িত্ব থেকে পলায়নের জন্য কী বড় পুরস্কার!
হামূদুর কমিশন তাঁকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেন, এভাবেই যারা শ্ত্রুর সাথে লড়াই করার পরিবর্তে পালিয়েছিল, পদত্যাগ করেছিল, যাদের কারনে পরিস্থিতি আমাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছিল, তাদেরকেই পুরস্কিত করা হয়।একইভাবে, এই রিপোর্টে টিক্কার নাম উল্লেখ করা হয় নি, যদিও ২৫ মার্চে তাঁর বর্বরচিত ভুমিকার জন্য তাঁকে কসাই নামে ডাকা হত।কমিশন তাঁর হায়েনার মত বর্বরচিত অপরাধগুলোকে এড়িয়ে গেছে।

রাও ফরমান আলীও দায়ী, তিনি ঢাকা অপারেশনের দায়িত্বে ছিলেন।

ভুট্টো সরকার হামূদুর রিপোর্টকে কেন জন-সম্মুখে প্রকাশ করে নি?

ভুট্টো রিপোর্টটি প্রকাশ করতে ভয় পাচ্ছিলেন, কারন পাকিস্তান ভাঙার জন্য তিনিও সমানভাবে দায়ী ছিলেন।ভুট্টোর সমর্থনপুষ্ট সাত সদস্য বিশিষ্ট একটি সাব-কমিটি এই রিপোর্টটি পরীক্ষা নিরিক্ষা করে দেখে রিপোর্টটিকে জন-সম্মুখে প্রকাশ না করতে সুপারিশ করেছিলেন।পরবর্তীতে ভুট্টো ক্ষমতার অপ-ব্যবহার করে এটিকে ইচ্ছেমত পরিবর্তন করে ৩৪ পৃষ্ঠার একটি রিপোর্টে পরিনত করেন।

আপনি জোর দিয়ে বলছেন হামূদুর রিপোর্ট ত্রুটিপূর্ণ, পক্ষপাতদুষ্ট এবং ভুট্টো কর্তৃক প্রভাবান্বিত।অপর দিকে, যারা ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন তাঁরা কেউই ঢাকা সঙ্কটের জন্য দায়ী জেনারেলদের কোর্ট-মার্শাল চান বলে মন হয় না।এই ক্ষেত্রে, আপনি কি অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার জন্য দৃঢ় কোনো প্রস্তাবনা দিতে পারেন?

১৯৭১ সালের সঙ্কটের প্রকৃত কারন খুঁজে বের করে দোষীদের শাস্তি দিতে হবে, এজন্য অধিক ক্ষমতাসম্পূর্ণ একটি নতুন কমিশনের নিয়োগ প্রদান করা প্রয়োজন।এই তদন্তটি সেনাবাহিনী প্রধানের সভাপতিত্বে হওয়া উচিত। দুটি সিন্ডিকেট এক সাথে কাজ করবে।

এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা তদন্ত কাজ হবে, এতে অনেক প্রয়োজনীয় তথ্য বের হয়ে আসবে। একটি সামরিক তদন্ত হওয়া উচিত প্রকৃত সত্য খুঁজে বের করার জন্য, কিভাবে এবং কেন একটি ছোট, ক্লান্ত ও দুর্বলভাবে সজ্জিত ইস্টার্ন গ্যারিসনকে (ইস্টার্ন কমান্ড) তাদের প্রতি অর্পিত দায়িত্ব পালন করে যেতে হয়েছিল সব ধরনের প্রতিকূল অবস্থা মোকাবেলা করে এবং পশ্চিম গ্যারিসন যারা পর্যাপ্ত সৈন্য ও রসদ নিয়েও কেন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারল না, যার কারনে যুদ্ধে পরাজীত হতে হয়েছিল এবং মাত্র দশ দিনেরও কম সময়ে দেশের ৫৫,০০০ বর্গমাইল ভূমি হারাতে হয়েছিল।

১৯৭৪ সালে ভারতীয় বন্দীদশা থেকে পাকিস্তানে ফেরার পর, পূর্ব পাকিস্তান সঙ্কট বিষয়ে যখন আমি রিপোর্ট প্রস্তুত করছিলাম, জেনারেল হেড কোয়্যাটার(GHQ) এর সূত্র থেকে স্পষ্ট একটি ইঙ্গিত পাচ্ছিলাম পূর্ব কমান্ডকে একটি বিস্তৃত পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিসর্জন দেওয়া হয়েছিল; এবং এর সিনিয়র কমান্ডারদের পূর্ব পাকিস্তান হারানোর জন্য দায়ী করে বলীর পাঁঠা বানানো হয়েছিল।আমার প্রাথমিক সন্দেহ কয়েক বছরের মধ্যেই দৃঢ় প্রত্যয়ে পরিনত হয়, আমি এই অধ্যায়টা নিয়ে অনেক ভেবেছি, বহু লোকের সাথে আলোচনা করেছি যারা জানতো কিভাবে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে জেনারেল হেড কোয়্যাটার(GHQ), হাই কমান্ডের গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে পূর্ব কমান্ডের সাথে প্রতারনা করেছিল, কুট-কৌশলের আশ্রয় নিয়ে পূর্ব কমান্ডকে ভুল পথে পরিচালিত করেছিল।

প্রকৃতপক্ষে এটা এতই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে, ভারতীয় মেজর জেনারেল শাহ বেগ সিং আমাকে বলেছিলেন, “আপনার আশা ধুলিস্যাৎ হয়ে গেছে, স্যার।তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এই অধ্যায়ের জন্য আপনি ও আপনার কমান্ডকে দায়ী করা হবে।” এর ফলে আমি নিশ্চিত হলাম, পূর্ব পাকিস্তানের ভাঙন ছিল স্পষ্টতই একটি সুচিন্তিত পরিকল্পনার অংশ।

পূর্ব পাকিস্তান সঙ্কট ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরী করা হয়েছিল, এই যুক্তির স্বপক্ষে আপনি কোনো প্রমাণ দিতে পারবেন?

মুজিবের ১৯৭০ সালের বিজয়কে ইয়াহিয়া ও ভুট্টো তিক্তভাবে নিয়েছিল, কারন এর ফলে ইয়াহিয়াকে রাষ্ট্রপতির পদ ছাড়তে হত এবং ভুট্টোকে অপজিশন বেঞ্চে বসতে হত, যা ছিল তাদের উচ্চাকাঙ্খার পরিপন্থী।তাই এই দুইজন একত্রে ভুট্টোর নিজের শহর লারকানায় বসে একটি পরিকল্পনা আঁটে, যা পরবর্তীতে লারকানা ষড়যন্ত্র নামে পরিচিতি পেয়েছিল।ন্যাশনাল অ্যাসেম্বেলির অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা, আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের পথকে কূটনৈতিকভাবে রুদ্ধ করা, ভীতি-প্রদর্শন করা, চক্রান্ত ও সেনাবাহিনীর ব্যবহার করা ছিল এই পরিকল্পনার অংশ।

এই ষড়যন্ত্রের সাথে যুক্ত হয়েছিল ‘এম এম আহমেদ প্ল্যান’, ইয়াহিয়াকে রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে বহাল রাখা ও ভুট্টোকে প্রধানমন্ত্রী করা ছিল যার লক্ষ্য, এছাড়াও পূর্ব পাকিস্তানকে কোনো উত্তরসূরি সরকার ছাড়াই ত্যাগ করা।অ্যাসেম্বেলি অধিবেশনের তারিখ ঘোষণা পর (যা ঢাকায় অনুষ্ঠিত হবার কথা ছিল) এটা বয়কট করার জন্য রাজনীতিবিদদের উপর চাপ ছিল।এর কারন দেখানো হয়েছিল, পূর্ব পাকিস্তান আন্তর্জাতিক চক্রান্তের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিনত হয়েছে, তাই এটি বাতিল করা উচিত।

শেষ পর্যন্ত, চক্রান্তকারী এই ক্ষুদ্র গোষ্ঠীটি তাদের উদ্দেশ্য সফল করতে পেরেছিল।

আপনি কি মনে করেন না, এখন সময় এসেছে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যেকার মত-পার্থক্যগুলো দূর করা এবং জন-সাধারনের মঙ্গলের জন্য একটি শান্তিপূর্ণ সংলাপের আয়োজন করা?

আমাদের কখনই ভারতকে বিশ্বাস করা উচিত নয়।একটি শক্তিশালী পাকিস্তানের ধারনা কোনো ভারতীয় সরকার কখনই মেনে নিতে পারে নি এবং তারা সব সময় আমাদের দেশটাকে দুর্বল করার চেষ্টা করেছে।পূর্ববর্তী নজির থেকে দেখা যায়, ভারত সব সময়ই পাকিস্তানের ক্ষতি করেছে।ভবিষ্যত্বে যদি তারা আবার কখনও সুযোগ পায়, পাকিস্তানের ক্ষতি করা থেকে কখনই নিবৃত হবে না।এমনকি বর্তমানে ভারত কাশ্মিরে হাজার হাজার ট্রুপ রেখেছে, জঙ্গী দমনের নামে নিরীহ মুসলমানদের হত্যা করছে।

এমনকি পাকিস্তান কোনোভাবেই ভারতের সাথে শান্তিপূর্ন সংলাপে বসতে পারে না, যদি না ভারত লিখিতভাবে এই প্রতিশ্রুতি দেয় যে, কাশ্মির বিরোধটি তারা “জাতিসংঘ রেজুলেশন” এর মাধ্যমে সমাধান করবে।

যদি সুযোগ আসে, কাশ্মির বিরোধের শান্তিপূর্ন সমাধানের জন্য নেওয়া বর্তমান এই কূটনৈতিক উদ্যোগে আপনি কি কোনো ভূমিকা রাখবেন?

না। আমি কখনই ভারতের সাথে এটা চাইবো না।আমি এখন খুবই বৃদ্ধ, যুদ্ধ করার মত অবস্থা নেই, তবুও জম্মু ও কাশ্মিরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কমান্ড দিতে এখনো প্রস্তুত আছি।

Friday, May 7, 2010

শত বর্ষে গীতাঞ্জলি

অনেকটা নিরবেই শতায়ু হতে চলেছে কবিগুরুর অমর এই সৃষ্টি।গীতাঞ্জলিকে ঘিরে বাংলা সাহিত্যে যতটা উচ্ছাস, আলোচনা ও গবেষনা হয়েছে ও হচ্ছে, অন্য কোনো গ্রন্থ নিয়ে এতটা আর হয় নি।শত বর্ষ পরেও গীতাঞ্জলির প্রতিটি গান/কবিতা একই রকম আবেদন সৃষ্টি করে।এক অদৃশ্য টানে পাঠককে মোহিত করে!এই অদৃশ্য টানের মূল সুর ঈশ্বর প্রেম, ঈশ্বরস্বত্তায় নিজেকে বিলীন করা, ঈশ্বরের মাঝে নিজেকে নিঃশর্ত আত্নসমর্পন!গীতাঞ্জলির মূল সুর ইশ্বরমুখিতা হলেও তা কোনো সম্প্রদায়-বিশেষের নয়।বিশ্বের বিশালতা ও প্রকৃতির সৌন্দর্য থেকে উৎসারিত এক আধ্যাত্নবোধের সঙ্গে এই বিশ্বাসযুক্ত।

গীতাঞ্জলি কবিগুরুর ১৫৭টি গান/কবিতার সংকলন।গানগুলি রচিত হয় ১৯০৮-০৯ সালে এবং শান্তিনিকেতন থেকে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় আগস্ট,১৯১০ (ভাদ্র,১৩১৭ বঙ্গাব্দ) খৃস্টাব্দে।এই গ্রন্থের প্রথম দিকের কয়েকটি গান গীতবিতান, স্বরবিতান, ব্রহ্মসঙ্গীত, পূজা, পূজা-আনন্দ, পূজা-বিরহ, প্রকৃতি, শেফালি, কেতকী, গীতলিপি প্রভৃতি গ্রন্থে প্রকাশিত হয় এবং কিছু সময় পরে কবিগুরু যে গানগুলো রচনা করেন তাদের পরস্পরের মধ্যে ভাবের ঐক্য থাকায় সবগুলো গানকে তিনি গীতাঞ্জলিতে সংকলিত করেন।গীতাঞ্জলির ভূমিকায় কবিগুরু নিজেই লিখেছেন,

“বিজ্ঞাপন
এই গ্রন্থের প্রথমে কয়েকটি গান পূর্বে অন্য দুই-একটি পুস্তকে প্রকাশিত হইয়াছে। কিন্তু অল্প সময়ের ব্যবধানে যে-সমস্ত গান পরে পরে রচিত হইয়াছে তাহাদের পরস্পরের মধ্যে একটি ভাবের ঐক্য থাকা সম্বভপর মনে করিয়া তাহাদের সকলগুলিই এই পুস্তকে একত্রে বাহির করা হইল।
শান্তিনিকেতন
শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বোলপুর
৩১ শ্রাবণ ১৩১৭”

গীতাঞ্জলির গানগুলো মূলত কবিতা।এগুলো সহজ ভাষায়, সাবলীল ছন্দে লিখিত।ভাবধারার দিক থেকে কবিতাগুলোকে বেশ কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়।
যেমন, প্রার্থনাঃ
বিপদে মোরে রক্ষা করো
এ নহে মোর প্রার্থনা ,
বিপদে আমি না যেন করি ভয় ।
দুঃখতাপে ব্যথিত চিতে
নাই-বা দিলে সান্ত্বনা ,
দুঃখে যেন করিতে পারি জয় ।
সহায় মোর না যদি জুটে
নিজের বল না যেন টুটে ,
সংসারেতে ঘটিলে ক্ষতি
লভিলে শুধু বঞ্চনা
নিজের মনে না যেন মানি ক্ষয় ।

আমারে তুমি করিবে ত্রাণ
এ নহে মোর প্রার্থনা ,
তরিতে পারি শকতি যেন রয় । (৪ নম্বর গান)

অন্তর মম বিকশিত করো
অন্তরতর হে ।
নির্মল করো উজ্জ্বল করো ,
সুন্দর করো হে ।
জাগ্রত করো , উদ্যত করো ,
নির্ভয় করো হে ।
মঙ্গল করো , নিরলস নিঃসংশয় করো হে ।
অন্তর মম বিকশিত করো ,
অন্তরতর হে । (৫ নম্বর গান)

তোমার দয়া যদি
চাহিতে নাও জানি
তবুও দয়া করে
চরণে নিয়ো টানি ।
আমি যা গড়ে তুলে
আরামে থাকি ভুলে
সুখের উপাসনা
করি গো ফলে ফুলে —
সে ধুলা-খেলাঘরে
রেখো না ঘৃণাভরে ,
জাগায়ো দয়া করে
বহ্নি-শেল হানি । (১৪৬ নম্বর গান)

ঈশ্বরকে না পাবার বেদনাঃ
বিশ্বে তোমার লুকোচুরি ,
দেশ-বিদেশে কতই ঘুরি ,
এবার বলো , আমার মনের কোণে
দেবে ধরা , ছলবে না ।
আড়াল দিয়ে লুকিয়ে গেলে
চলবে না । (২৩ নম্বর গান)


যদি তোমার দেখা না পাই প্রভু ,
এবার এ জীবনে
তবে তোমায় আমি পাই নি যেন
সে কথা রয় মনে ।
যেন ভুলে না যাই , বেদনা পাই
শয়নে স্বপনে । (২৪ নম্বর গান)


হেরি অহরহ তোমারি বিরহ
ভুবনে ভুবনে রাজে হে ।
কত রূপ ধ'রে কাননে ভূধরে
আকাশে সাগরে সাজে হে ।
সারা নিশি ধরি তারায় তারায়
অনিমেষ চোখে নীরবে দাঁড়ায় ,
পল্লবদলে শ্রাবণধারায়
তোমারি বিরহ বাজে হে । (২৫ নম্বর গান)


বিশ্ব যখন নিদ্রামগন ,
গগন অন্ধকার ;
কে দেয় আমার বীণার তারে
এমন ঝংকার ।
নয়নে ঘুম নিল কেড়ে ,
উঠে বসি শয়ন ছেড়ে ,
মেলে আঁখি চেয়ে থাকি
পাই নে দেখা তার । (৬০ নম্বর গান)


সে যে পাশে এসে বসেছিল
তবু জাগি নি ।
কী ঘুম তোরে পেয়েছিল
হতভাগিনী ।
এসেছিল নীরব রাতে
বীণাখানি ছিল হাতে ,
স্বপনমাঝে বাজিয়ে গেল
গভীর রাগিণী । (৬১ নম্বর গান)


নিজের অহংকার ত্যাগ ও হৃদয় নির্মল করে সহনশীলতা প্রদর্শনঃ
আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার
চরণধুলার তলে ।
সকল অহংকার হে আমার
ডুবাও চোখের জলে ।
নিজেরে করিতে গৌরব দান
নিজেরে কেবলি করি অপমান ,
আপনারে শুধু ঘেরিয়া ঘেরিয়া
ঘুরে মরি পলে পলে ।
সকল অহংকার হে আমার
ডুবাও চোখের জলে । (১ নম্বর গান)


নামাও নামাও আমায় তোমার
চরণতলে ,
গলাও হে মন , ভাসাও জীবন
নয়নজলে ।

একা আমি অহংকারের
উচ্চ অচলে ,
পাষাণ-আসন ধুলায় লুটাও ,
ভাঙো সবলে ।
নামাও নামাও আমায় তোমার
চরণতলে । (৫৩ নম্বর গান)

তোমার সাথে নিত্য বিরোধ
আর সহে না —
দিনে দিনে উঠছে জমে
কতই দেনা ।

সবাই তোমায় সভার বেশে
প্রণাম করে গেল এসে ,
মলিন বাসে লুকিয়ে বেড়াই
মান রহে না (১৫০ নম্বর গান)

ঈশ্বরের ক্ষণদর্শনানুভূতিঃ
প্রভু তোমা লাগি আঁখি জাগে ;
দেখা নাই পাই ,
পথ চাই ,
সেও মনে ভালো লাগে ।

ধুলাতে বসিয়া দ্বারে
ভিখারি হৃদয় হা রে
তোমারি করুণা মাগে ।
কৃপা নাই পাই ,
শুধু চাই ,
সেও মনে ভালো লাগে । (২৮ নম্বর গান)

নিভৃত প্রাণের দেবতা
যেখানে জাগেন একা ,
ভক্ত , সেথায় খোলো দ্বার ,
আজ লব তাঁর দেখা ।
সারাদিন শুধু বাহিরে
ঘুরে ঘুরে কারে চাহি রে ,
সন্ধ্যাবেলার আরতি
হয় নি আমার শেখা । (৫০ নম্বর গান)

তুমি এবার আমায় লহো হে নাথ , লহো ।
এবার তুমি ফিরো না হে —
হৃদয় কেড়ে নিয়ে রহো ।
যে দিন গেছে তোমা বিনা
তারে আর ফিরে চাহি না ,
যাক সে ধুলাতে ।
এখন তোমার আলোয় জীবন মেলে
যেন জাগি অহরহ । (৫৭ নম্বর গান)

দীন-হীন-পতিতের মাঝে ঈশ্বরকল্পনাঃ
এই মলিন বস্ত্র ছাড়তে হবে
হবে গো এইবার —
আমার এই মলিন অহংকার ।
দিনের কাজে ধুলা লাগি
অনেক দাগে হল দাগি ,
এমনি তপ্ত হয়ে আছে
সহ্য করা ভার ।
আমার এই মলিন অহংকার । (৪১ নম্বর গান)

যেথায় থাকে সবার অধম দীনের হতে দীন
সেইখানে যে চরণ তোমার রাজে
সবার পিছে , সবার নীচে ,
সব-হারাদের মাঝে ।
যখন তোমায় প্রণাম করি আমি ,
প্রণাম আমার কোন্খানে যায় থামি ,
তোমার চরণ যেথায় নামে অপমানের তলে
সেথায় আমার প্রণাম নামে না যে
সবার পিছে , সবার নীচে ,
সব-হারাদের মাঝে । (১০৭ নম্বর গান)

নিন্দা দুঃখে অপমানে
যত আঘাত খাই
তবু জানি কিছুই সেথা
হারাবার তো নাই ।
থাকি যখন ধুলার'পরে
ভাবতে না হয় আসনতরে ,
দৈন্যমাঝে অসংকোচে
প্রসাদ তব চাই । (১২৬ নম্বর গান)

অসীম-সসীমের লীলাতত্বঃ
কোথায় আলো , কোথায় ওরে আলো ।
বিরহানলে জ্বালো রে তারে জ্বালো ।
রয়েছে দীপ না আছে শিখা ,
এই কি ভালে ছিল রে লিখা —
ইহার চেয়ে মরণ সে যে ভালো ।
বিরহানলে প্রদীপখানি জ্বালো । (১৭ নম্বর গান)

ধনে জনে আছি জড়ায়ে হায় ,
তবু জান , মন তোমারে চায় ।
অন্তরে আছ হে অন্তর্যামী ,
আমা চেয়ে আমায় জানিছ স্বামী —
সব সুখে দুখে ভুলে থাকায়
জান , মম মন তোমারে চায় ।

ছাড়িতে পারি নি অহংকারে ,
ঘুরে মরি শিরে বহিয়া তারে ,
ছাড়িতে পারিলে বাঁচি যে হায় —
তুমি জান , মন তোমারে চায় । (২৯ নম্বর গান)

জগতে আনন্দযজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ ।
ধন্য হল ধন্য হল মানবজীবন ।
নয়ন আমার রূপের পুরে
সাধ মিটায়ে বেড়ায় ঘুরে ,
শ্রবণ আমার গভীর সুরে
হয়েছে মগন । (৪৪ নম্বর গান)

আমার নামটা দিয়ে ঢেকে রাখি যারে
মরছে সে এই নামের কারাগারে ।
সকল ভুলে যতই দিবারাতি
নামটারে ওই আকাশপানে গাঁথি ,
ততই আমার নামের অন্ধকারে
হারাই আমার সত্য আপনারে । (১৪৩ নম্বর গান)

প্রকৃতির মাঝে ঈশ্বর বন্দনাঃ
আজ ধানের খেতে রৌদ্রছায়ায়
লুকোচুরি খেলা ।
নীল আকশে কে ভাসালে
সাদা মেঘের ভেলা ।
আজ ভ্রমর ভোলে মধু খেতে ,
উড়ে বেড়ায় আলোয় মেতে ;
আজ কিসের তরে নদীর চরে
চখাচখির মেলা । (৮ নম্বর গান)

আমরা বেঁধেছি কাশের গুচ্ছ , আমরা
গেঁথেছি শেফালিমালা ।
নবীন ধানের মঞ্জরী দিয়ে
সাজিয়ে এনেছি ডালা ।
এসো গো শারদলক্ষ্মী , তোমার
শুভ্র মেঘের রথে ,
এসো নির্মল নীল পথে ,
এসো ধৌত শ্যামল
আলো-ঝলমল
বনগিরিপর্বতে ।
এসো মুকুটে পরিয়া শ্বেত শতদল
শীতল-শিশির-ঢালা । (১১ নম্বর গান)

মেঘের'পরে মেঘ জমেছে ,
আঁধার করে আসে ,
আমায় কেন বসিয়ে রাখ
একা দ্বারের পাশে ।
কাজের দিনে নানা কাজে
থাকি নানা লোকের মাঝে ,
আজ আমি যে বসে আছি
তোমারি আশ্বাসে । (১৮ নম্বর গান)

আজি শ্রাবণ-ঘন-গহন-মোহে
গোপন তব চরণ ফেলে
নিশার মতো নীরব ওহে
সবার দিঠি এড়ায়ে এলে ।
প্রভাত আজি মুদেছে আঁখি ,
বাতাস বৃথা যেতেছে ডাকি ,
নিলাজ নীল আকাশ ঢাকি
নিবিড় মেঘ কে দিল মেলে । (১৮ নম্বর গান)

আজ বারি ঝরে ঝর ঝর
ভরা বাদরে ।
আকাশ-ভাঙা আকুল ধারা
কোথাও না ধরে ।
শালের বনে থেকে থেকে
ঝড় দোলা দেয় হেঁকে হেঁকে ,
জল ছুটে যায় এঁকেবেঁকে
মাঠের'পরে । (২৭ নম্বর গান)

আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে ।
তব অবগুণ্ঠিত কুণ্ঠিত জীবনে
কোরো না বিড়ম্বিত তারে ।
আজি খুলিয়ো হৃদয়দল খুলিয়ো ,
আজি ভুলিয়ো আপনপর ভুলিয়ো ,
এই সংগীত-মুখরিত গগনে
তব গন্ধ তরঙ্গিয়া তুলিয়ো ।
এই বাহির ভুবনে দিশা হারায়ে
দিয়ো ছড়ায়ে মাধুরী ভারে ভারে । (৫৫ নম্বর গান)

জননীরূপে ঈশ্বরকল্পনাঃ
তোমার সোনার থালায় সাজাব আজ
দুখের অশ্রুধার ।
জননী গো , গাঁথব তোমার
গলার মুক্তাহার !
চন্দ্র সূর্য পায়ের কাছে
মালা হয়ে জড়িয়ে আছে ,
তোমার বুকে শোভা পাবে আমার
দুখের অলংকার । (১০ নম্বর গান)

জননী , তোমার করুণ চরণখানি
হেরিনু আজি এ অরুণকিরণ রূপে ।
জননী , তোমার মরণহরণ বাণী
নীরব গগনে ভরি উঠে চুপে চুপে ।
তোমারে নমি হে সকল ভুবন-মাঝে ,
তনু মন ধন করি নিবেদন আজি
ভক্তিপাবন তোমার পূজার ধূপে ।
জননী , তোমার করুণ চরণখানি
হেরিনু আজি এ অরুণকিরণ রূপে । (১৪ নম্বর গান)

ইংরেজী অনুবাদ:
গীতাঞ্জলি'র কবিতা/গানগুলোর অনুবাদ শুরু করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্বয়ং। ৫৩টি গানের অনুবাদ গীতাঞ্জলি: দ্য সং অফারিংস‎ গ্রন্থে সংকলিত হয়। রবীন্দ্রনাথ সবগুলো কবিতা/গানের অনুবাদ সম্পন্ন করেন নি। গীতাঞ্জলি'র সবগুলো কবিতা/গানগুলোর অনুবাদ যারা করেছেন তাদের মধ্যে আছেন ব্রাদার জেমস এবং ব্রিটিশ কবি ও অনুবাদক জো উইন্টার।
নিচে গীতাঞ্জলি কাব্যের ১২৫ সংখ্যক গানটি উদ্ধৃত হল:
“আমার এ গান ছেড়েছে তার সকল অলংকার
তোমার কাছে রাখেনি আর সাজের অহংকার।
অলংকার যে মাঝে প’ড়ে
মিলনেতে আড়াল করে,
তোমার কথা ঢাকে যে তার মুখর ঝংকার।

তোমার কাছে খাটে না মোর কবির গরব করা–
মহাকবি, তোমার পায়ে দিতে চাই যে ধরা।
জীবন লয়ে যতন করি
যদি সরল বাঁশি গড়ি,
আপন সুরে দিবে ভরি সকল ছিদ্র তার।”

এই কবিতাটির ইংরেজি অনুবাদ করেন রবীন্দ্রনাথই (Gitanjali, verse VII):
"My song has put off her adornments. She has no pride of dress and decoration. Ornaments would mar our union; they would come between thee and me; their jingling would drown thy whispers."

"My poet's vanity dies in shame before thy sight. O master poet, I have sat down at thy feet. Only let me make my life simple and straight, like a flute of reed for thee to fill with music."

“গীতাঞ্জলি: দ্য সং অফারিংস‎” ইংরেজী ভাষায় অনূদিত রবীন্দ্রনাথের প্রথম সংকলনগ্রন্থ।“গীতাঞ্জলি” নামটি বিশ্লেষন করলে দাঁড়ায় গীত+অঞ্জলী=গীতাঞ্জলি। গীত বা Song ও অঞ্জলী বা Offerings থেকেই কবিগুরু এই গ্রন্থটির নামকরণ করেন Song Offerings।অনূদিত কবিতাগুলি পাশ্চাত্যে খুবই সমাদৃত হয়। কিন্তু গ্রন্থদুটির নাম অভিন্ন হলেও ইংরেজী গীতাঞ্জলিতে বাংলা গীতাঞ্জলি'র একচ্ছত্র আধিপত্য নেই।

রবীন্দ্রনাথ বাংলা গীতাঞ্জলি'র ১৫৭টি গান/কবিতা থেকে ইংরেজি গীতাঞ্জলিতে (Song Offerings) মাত্র ৫৩টি স্থান দিয়েছেন। বাকি ৫৪টি বেছে নিয়েছেন গীতিমাল্য, নৈবেদ্য, খেয়া, শিশু, কল্পনা, চৈতালি, উৎসর্গ, স্মরণ ও অচলায়তন থেকে। গীতিমাল্য থেকে ১৬টি, নৈবেদ্য থেকে ১৫টি, খেয়া থেকে ১১টি, শিশু থেকে ৩টি, কল্পনা থেকে ১টি, চৈতালি থেকে ১টি, উতসর্গ থেকে ১টি, স্মরণ থেকে ১টি এবং অচলায়তন থেকে ১টি কবিতা/গান নিয়ে তিনি ইংরেজি গীতাঞ্জলির বিন্যাস করেছেন। অর্থাৎ ইংরেজি গীতাঞ্জলিতে তিনি মোট ৯টি গ্রন্থের কবিতা বা গানের সন্নিবেশ ঘটিয়েছেন।

গীতাঞ্জলি: দ্য সং অফারিংসে প্রথম গান হিসেবে কবিগুরু গীতিমাল্যের ২৩ নম্বর গানটিকে স্থান দিয়েছেন।
আমারে তুমি অশেষ করেছ
এমনি লীলা তব।
ফুরায়ে ফেলে আবার ভরেছ
জীবন নব নব।
কত যে গিরি কত যে নদীতীরে
বেড়ালে বহি ছোটো এ বাঁশিটিরে,
কত যে তান বাজালে ফিরে ফিরে
কাহারে তাহা কব।

তোমারি ওই অমৃতপরশে
আমার হিয়াখানি
হারালো সীমা বিপুল হরষে
উথলি’ উঠে বাণী।
আমার শুধু একটি মুঠি ভরি
দিতেছ দান দিবসবিভাবরী,
হল না সারা কত-না যুগ ধরি,
কেবলই আমি লব।

যার ইংরেজী অনুবাদ কবিগুরু নিজেই করেছেনঃ
"Thou hast made me endless, such is thy
pleasure. This frail vessel thou emptiest
again and again, and fillest it ever with
fresh life.

This little flute of a reed thou hast carried
over hills and dales, and hast breathed
through it melodies eternally new.

At the immortal touch of thy hands my little
heart loses its limits in joy and gives birth
to utterance ineffable.

Thy infinite gifts come to me only on these
very small hands of mine. Ages pass, and
still thou pourest, and still there is room to
fill."

অনুবাদের ইতিহাস:
১৯১২ খ্রিস্টাব্দের শুরুর দিকে রবীন্দ্রনাথের জাহাজযোগে লণ্ডন যাওয়ার কথা ছিল। যাত্রার পূর্বে তিনি অর্শ রোগের কারণে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং পদ্মা নদীতে নৌকায় বিশ্রাম নিতে শুরু করেন। এ সময় তিনি তাঁর গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ থেকে সহজ ইংরেজীতে অনুবাদ শুরু করেন। পরবর্তীতে গীতাঞ্জলি ৫২টি এবং গীতিমাল্য, নৈবেদ্য, খেয়া প্রভৃতি আরো নয়টি কাব্যগন্থ থেকে ৫১টি - সর্বমোট ১০৩টি কবিতার অনুবাদ নিয়ে একটি পাণ্ডুলিপি তৈরী করেন। এই পাণ্ডুলিপি সঙ্গে করে রবীন্দ্রনাথ ২৭ মে ১৯১২ বোম্বাই বন্দর থেকে বিলেত যাত্রা করেন। তিনি লন্ডনে পৌঁছান ১৬ জুন। এ সময় ইউলিয়াম রোদেনস্টাইনের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় এবং পাণ্ডুলিপিটি তাকে দেয়া হয়। ১৯১২ খ্রিস্টাব্দের শেষের দিকে লণ্ডনে ইন্ডিয়া সোসাইটি কর্তৃক গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। সঙ্গ অফরিংস-এর ভূমিকা লিখেছিলেন স্বয়ং কবি ইয়েটস্। এ ভূমিকাটি ছিল একই সঙ্গে আন্তরিক ও যথেষ্ট প্রশস্তিতমূলক।ভূমিকাটির কিছু অংশ এমনঃ
“I have carried the manuscript of these translations about with me for days, reading it in railway trains, or on the top of omnibuses and in restaurants, and I have often had to close it lest some stranger would see how much it moved me. These lyrics-- which are in the original, my Indians tell me, full of subtlety of rhythm, of untranslatable delicacies of colour, of metrical invention--display in their thought a world I have dreamed of all my live long. The work of a supreme culture, they yet appear as much the growth of the common soil as the grass and the rushes. A tradition, where poetry and religion are the same thing, has passed through the centuries, gathering from learned and unlearned metaphor and emotion, and carried back again to the multitude the thought of the scholar and of the noble.”

নিজ অনুবাদে রবীন্দ্রনাথ বেশ স্বাধীনতা নিয়েছিলেন। আক্ষরিক তো নয়ই বরং ভাবানুবাদেরও বেশি ; কখনো কবিতাংশ সংক্ষেপিত করা হয়েছে কখনো বা শুধু ভাবার্থ করা হয়েছে ; কেবল কবিতার ভাবসম্পদ অক্ষত রাখা হয়েছে। ইংরেজিভাষী সমালোচকরা সানন্দে তাঁর অনুবাদের উৎকর্ষতা স্বীকার করেছেন। তবে এ উৎকর্ষতার ক্রমাবনতি হয়েছিল বলে মনে করা হয়। রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশায় ইংরেজ পাঠক ও সমালোচক এবং রবি-জীবনীকার এডওয়ার্ড টম্পসন মন্তব্য করেছেন, "প্রথম দিকের অনুবাদ ছিল নিখুঁত ও মনোরম ; শেষের দিকে অযত্নে ও নৈমিত্তিকভাবে অনুবাদের কাজ সারা হয়েছে"। তবে স্বকৃত অনুবাদ নিয়ে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের মনেই দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছিল। ইয়োরোপে যাওয়ার আগে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়ে শিলাইদহে নীত হন, তখন সময় কাটানোর ছলেই তিনি গীতাঞ্জলি’র অনুবাদে হাত দেন। কিন্তু প্রিয় কবিতাগুলোর অনুবাদ তাঁর কাছে সন্তোষজনক মনে হয়নি, মনে হয়েছিল ‘school-boy exercise'।

সুত্রঃ
১. রবীন্দ্র-রচনাবলী, ভাষা প্রযুক্তি গবেষণা পরিষদ।
২. গীতাঞ্জলি
৩. Gitanjali - Song Offerings
৪. উইকিপিডিয়া
৫. ড. সৌমিত্র শেখর, বাংলা ভাষা ও সাহিত্য জিজ্ঞাসা।

Wednesday, April 28, 2010

একাত্তরে সংগঠিত যুদ্ধাপরাধঃ হামুদুর রহমান কমিশন রিপোর্ট

১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে পাকিস্তানের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি পাকিস্তানের প্রধাণ বিচারপতি হামুদুর রহমানকে প্রধান করে “The War Inquiry Commission” গঠন করেন। এই কমিশন গঠনের উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তান কেন যুদ্ধে পরাজিত হল ও পূর্ব পাকিস্তানকে হারালো, তার কারণ অনুসন্ধানের জন্য।

কমিশন তিনশ প্রত্যক্ষদর্শীর স্বাক্ষ্য ও যুদ্ধের সময় পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে সেনাবাহিনী কর্তৃক আদান-প্রদানকৃত গোপনীয় তথ্যগুলো পরিক্ষা করে দেখেন। কমিশন সর্ব বিস্তৃত স্বেচ্ছাচারীতা, জেনেরেলদের ক্ষমতার অপ-ব্যবহার, বেসামরিক নেতৃত্বের সম্পূর্ণ ব্যর্থতা ও সামরিক শাসকদের নেতৃত্বকেই পাকিস্তান ভাঙার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। এই রিপোর্টে যুদ্ধাপরাধের যে চিত্র উঠে এসেছে, তা দেখে শিউরে উঠতে হয়। স্বভাবতই তিনি অনেক তথ্য চেপে গিয়েছেন; তারপরও একজন পাকিস্তানী নাগরিকের চোখে যে তথ্যগুলো উঠে এসেছে, বাস্তব অবস্থা আরো কত ভয়ঙ্কর ছিলো তা সহজেই অনুমেয়।

কমিশন যে তথ্যগুলো উপস্থাপন করেছেন তার সারমর্ম এমনঃ
১. বেসামরিক নাগরিক ও বাঙালি সৈন্যসহ হাজার হাজার বাংলাদেশিকে হত্যা করা হয়।
২. সারা পূর্ব পাকিস্তান জুড়েই চলে ধর্ষন, লুট, ব্যাংক ডাকাতির মহা-উৎসব।
৩. পাকিস্তানি সৈন্য ও জেনারেলদের মাতলামী; এমনও দেখা গেছে ভারতীয় বোমারু বিমান বোমা বর্ষণ করছে, অথচ পাকিস্তানি অফিসাররা বন্দী নারীদের সাথে পাশবিকতার লালসায় ও অত্যাচারের উদ্দেশ্যে সেনা ক্যাম্পের টর্চার সেলে প্রবেশ করছে।
এই কমিশন পাকিস্তানি আর্মি ও তাদের সহায়ক বাহিনীকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিদানের জন্য কোর্ট-মার্শাল করার সুপারিশ করে ছিল।কিন্তু সেনা নিয়ন্ত্রিত পাকিস্তানি সরকারগুলো এই রিপোর্টকে শুধু অবজ্ঞায় করে নি, বরং বিভিন্নভাবে এটাকে গোপন রাখার চেষ্টা করেছে।


কমিশনের প্রধাণ বিচারপতি হামুদুর রহমান তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জুলফিকার আলী ভুট্টর কাছে চূড়ান্ত রিপোর্টটি হস্তান্তর করছেন।

কমিশন পাকিস্তানের রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, সামরিক ও নৈতিক পরাজয়ের স্বরূপ উদঘাটন চূড়ান্ত রিপোর্টটি ১৯৭৪ সালের ২৩ অক্টোবর পাকিস্তানের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জুলফিকার আলী ভুট্টর কাছে হস্তান্তর করেন। পাকিস্তান যুদ্ধাপরাধের নির্মম এই স্বাক্ষ্যকে দশকের পর দশক গোপনীয় দলিল (classified) হিসেবে চিহ্নিত করে রাখে।পাকিস্তান সরকার জুলফিকার আলী ভুট্টোর কাছে সংরক্ষিত অনুলিপিটি ছাড়া হামুদুর রহমান কমশনের চূড়ান্ত রিপোর্টের সকল অনুলিপি ধংষ করে ফেলে। কিন্তু ১৯৯৯ সালে ভারতীয় সংবাদপত্রে এই রিপোর্ট হুবুহু প্রকাশ হয়ে পড়লে, বিশ্ববাসী প্রথম জানতে পারে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার, আল-বদর, আল-শামসদের নিষ্ঠুরতাকে। পাকিস্তানের অভ্যন্তরেও দানা বেধে উঠতে থাকে যুদ্ধাপরাধের বিচারের সোচ্চার দাবী ও বাংলাদেশের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ার আহবান।

কমিশনের রিপোর্টির কিছু অংশ এখানে উদ্ধৃত করছিঃ

“The excesses committed by the Pakistani Army fall into the following categories:- a) Excessive use of force and fire power in Dacca during the night of the 25th and 26th of March 1971 when the military operation was launched. b) Senseless and wanton arson and killings in the countryside during the course of the “sweeping operations” following the military action. c) Killing of intellectuals and professionals like doctors, engineers, etc and burying them in mass graves not only during early phases of the military action but also during the critical days of the war in December 1971. d) Killing of Bengali Officers and men of the units of the East Bengal Regiment, East Pakistan Rifles and the East Pakistan Police Force in the process of disarming them, or on pretence of quelling their rebellion. e) Killing of East Pakistani civilian officers, businessmen and industrialists, or their mysterious disappearance from their homes by or at the instance of Army Officers performing Martial Law duties. f) Raping of a large number of East Pakistani women by the officers and men of the Pakistan army as a deliberate act of revenge, retaliation and torture. g) Deliberate killing of members of the Hindu minority.”

যার সরল বাংলা অর্থ এমন দাঁড়ায়ঃ

পাকিস্তান আর্মির যুদ্ধাপরাধকে নিম্মোক্তভাবে শ্রেণীকরণ করা যায়ঃ
ক) ২৫ ও ২৬ মার্চ রাত্রে ঢাকায় যখন সেনা অভিযান চলছিল, পাকিস্তান সৈন্য বাহিনী অতিরিক্ত শক্তি অ গোলা বারুদ ব্যবহার করে।
খ) সেনা-বাহিনী কর্তৃক সারাদেশে “sweeping operations” এর নামে অবিবেচনাপ্রসুত ও নিষ্ঠুর গন-হত্যা চলে।
গ) যুদ্ধের শুরুর দিকে ও ডিসেম্বরর ক্রান্তিকালীণ সময়গুলোতে দিকে বুদ্ধিজীবী, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারসহ পেশাজীবীদের নির্বিচারে হত্যা করে গণ-কবর দেওয়া হয়।
ঘ) বাঙালি অফিসার বিশেষ করে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস ও ইস্ট পাকিস্তান পুলিশের বাঙলি সৈন্যদের নিরস্ত্র করার নামে ও বিদ্রোহের মিথ্যা ও কপট অভিযোগে নির্বিচারে হত্যা করা হয়।
ঙ) পাকিস্তানি অফিসাররা মার্শাল ল ডিউটি পালন করার সময় নির্বিচারে বেসামরিক বাঙালি অফিসার, ব্যবসাহী, শিল্পপতিদের হত্যা করে, ঘর-বাড়িগুলোতে লুট, অগ্নি-সংযোগ করে।
চ) প্রতিশোধ, আক্রোশ ও নির্যাতনের উদ্দেশ্যে পূর্ব পাকিস্তানের বিরাট অংশের নারী গোষ্ঠীকে পাকিস্তানি অফিসার ও তাদের দোসরেরা ধর্ষণ করে।
ছ) সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষদের নির্বিচারে হত্যা করা হয়।

সম্পূর্ণ রিপোর্টির ডাউনলোড লিংকঃ
১. introduction
২. cabinet note
৩. press release
৪. chapter 1
৫. chapter 2
৬. chapter 3
৭. chapter 4
৮. chapter 5
৯. Annexure

Tuesday, April 6, 2010

সমকালীন বাংলা কমিউনিটি ব্লগ ভাবনা

বাংলা ব্লগের ইতিহাসঃ
বাংলা ভাষায় “বাঁধ ভাঙা আওয়াজ” স্লোগান নিয়ে প্রথম বাংলা কমিউনিটি ব্লগ “সামহোয়্যার ইন ব্লগের” যাত্রা শুরু।
২০০৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর দুপুর ২টা ২৬ মিনিটে ব্লগার দেবরার “ইমরান ব্লগ স্রষ্টা” শিরোনামে প্রথম পোস্টের মাধ্যমে শুরু হয় বাংলা কমিউনিটি ব্লগের অগ্রযাত্রা।

“ইমরান তুমি একটা ভাল কাজ করেছ, হাসিন ভাই আপনাকেও ধন্যবাদ। আপনাদের জানাই আমাদের শুভু কামনা।”
এই দুই লাইন দিয়েই শুরু। মজার ব্যাপার পোস্টটিতে ১৮ ই জুলাই, ২০০৬ রাত ৮টা ০৭ মিনিটে প্রথম মন্তব্য পড়ে। মাঝখানে প্রায় সাত মাস! ব্লগার সারিয়া তাসনিমের মন্তব্য,” প্রথম পোস্ট অথচ মন্তব্য বিহীন ।
ভালো লাগছে প্রথম পোস্টে মন্তব্য করতে পেরে”।

“চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির” স্লোগান নিয়ে ২০০৭ সালের মে মাসে যাত্রা শুরু করে আরেকটি বাংলা কমিউনিটি ব্লগ “সচলায়তন”।

২২ অক্টোবর ২০০৮ সালে বাংলা কমিউনিটি ব্লগ জগতে আবির্ভাব হয় “প্রথম আলো ব্লগের”।
এভাবেই এগিয়েছে একটু একটু করে এগিয়ে চলেছে বাংলা ব্লগিং। কৈশোর পেরিয়ে রীতিমত যৌবনে পদার্পন। এখন অনেকটাই পরিনত হয়েছে বাংলা ব্লগিং। আমরাও ব্লগিং ধারনার সাথে নিজেদের একটু একটু করে গুছিয়ে নিয়েছি, মানিয়ে নিয়েছি।এই দীর্ঘ সময় পরে একটু যদি পিছন ফিরে তাকাই, গর্বে বুক ভরে যায় আমাদের। বাংলা ব্লগিংএ আমাদের অর্জন অনেক।অনেক অমিত সম্ভাবনা হাতছানি দিয়ে ডাকছে আমাদের।

বাংলা ব্লগ দিবসঃ
আন্তর্জালের বিস্তৃত দুনিয়ায় এখন বেশ কয়েকটি বাংলা ব্লগ আছে। নতুনের তালিকায় আরো বাংলা ব্লগ আসছে। প্রতিটি ব্লগেরই নিজস্ব মতাদর্শ ও বিশ্বাস আলাদা, ব্লগারদের কাছে এদের জনপ্রিয়তার ধরনও আলাদা।মতাদর্শের হের-ফের থাকলেও বাংলা ভাষার চর্চা এবং বিশ্বজুড়ে মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় প্রকৃতপক্ষে সবার উদ্দেশ্য অভিন্ন। এই অভিন্ন ও সম্মিলিত বিশ্বাসকে সামনে রেখে এবং বাংলা ভাষাকে বিশ্বময় আরো ছড়িয়ে দেবার জন্যে গতবছর ১৯শে ডিসেম্বর,শনিবার, ২০০৯ পালিত হয় "বাংলা ব্লগ দিবস" ।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বাংলা ব্লগঃ
১. প্রথম আলো ব্লগের নীতিমালার ৬ এর (ক) তে আছে, “বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে অবমাননা ও কটাক্ষমূলক কোনো লেখা প্রকাশ করা যাবে না”।

২. সচলায়তনের নীতিমালার প্রথম বাক্যতে আছে “সচলায়তন বেশ কিছু বিষয়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, মুক্তিসংগ্রাম ও অসাম্প্রদায়িকতার মতো বিষয়গুলিকে আক্রমণ করে লেখা পোস্ট, মন্তব্য বা অন্যান্য উপাদান সচলায়তন থেকে মডারেটরবৃন্দ যে কোন সময় অপসারণ করতে পারেন"।

৩. আমার ব্লগের নীতিমালার প্রথমেই আছে, “আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তি কর্তৃক বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধী কোনো প্রচারণা আমারব্লগ ডট কমে আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলো।”।
এভাবে বাংলা কমিউনিটি ব্লগগুলোর নীতিমালায় গুলো দেখলেই বুঝা যায়, প্রতিটি ব্লগই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী ও শ্রদ্ধাশীল।

সচলায়তনের কথা আলাদা না করে বললেই নয়। কিছু আন্তর্জালিক দুঃষ্কৃতকারী মিথ্যা ও ভুলভাবে আন্তর্জালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিকৃত ইতিহাস তুলে ধরছে। সচলায়তন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরকে সাথে নিয়ে উইকিপিডিয়ায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সঠিক ও নির্মোহ ইতিহাস রচনায় নেমে পড়েছেন “উইকিযুদ্ধ - মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লেখার সমবেত প্রয়াস”।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে জনমত গঠনঃ

সামহোয়্যার ইন ব্লগ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে গন-স্বাক্ষর কর্মসূচী অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। এর জন্য তারা তাদের প্রথম পৃষ্ঠায় একটি পিটশন ফরম ডাউনলোড সংযুক্তি দিয়েছেন।

আমার ব্লগের নীতিমালার শুরুতেই আছে, “যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিপরীত যে কোনো প্রচারণা আমারব্লগ ডট কমে কঠোরভাবে দমন করা হবে”।
এছাড়া আমার ব্লগ ১৪ই ডিসেম্বরের দল (14december.org) কে সাথে নিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে জনমত গঠনের কাজ শুরু করে দিয়েছেন।

প্রথম আলো ব্লগে সে রকম প্রচেষ্টা দেখা না গেলেও, এর অনেক ব্লগারই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন সময় পোস্ট দিয়ে যাচ্ছেন।

গনতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িকতাঃ
প্রথম আলো ব্লগের নীতিমালা ২ এ আছেঃ
ক) দেশীয় বা দেশের বাইরের কোনো জাতি, গোষ্ঠী, ভাষা ও ধর্মের প্রতি অবমাননামূলক বা কারো অনুভূতিতে আঘাত দিতে পারে এমন কোনো লেখা প্রকাশ করা যাবে না।
খ) বিবদমান দুই বা ততোধিক জাতি, গোষ্ঠী ও ধর্মের মধ্যে জাতিগত সংঘর্ষের উস্কানি দিতে পারে এমন লেখা প্রকাশ করা যাবে না।
গ) ক্ষুদ্র জাতিসত্তা বা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ধর্ম, সংস্কৃতি, আচার, জীবনযাত্রা, খাদ্যাভ্যাস বা ভাষাকে কটাক্ষ বা অবমাননা করে কোনো বক্তব্য দেওয়া যাবে না।
ঘ) প্রচলিত ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ অনুসারে শ্রদ্ধেয় কোনো ব্যক্তিকে হেয় করে কোনো মন্তব্য করা যাবে না।
ঙ) কোনো জাতি, জনজাতি, গোষ্ঠী, জাতি-উৎস, লিঙ্গপরিচয়, বয়স, শ্রেণীপরিচয়, শারীরিক ও মানসিক অক্ষমতা নিয়ে ঘৃণা বা অবমাননামূলক কোনো মন্তব্য প্রকাশ করা যাবে না।
চ) ধর্মগ্রন্থের বাণী ত্রুটিপূর্ণভাবে উদ্ধৃত করা যাবে না। এমনভাবে ধর্মগ্রন্থের বাণী উদ্ধৃত করা যাবে না, যাতে ধর্ম বা বাণীর অসম্মান হয়।

সামহোয়্যার ইন ব্লগের নীতিমালায় আছে, “বাংলাদেশ অথবা যে কোন স্বীকৃত জাতি বা দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, ইতিহাস, ধর্ম বিষয়ক সত্যকে অস্বীকার করে, বিরুদ্ধাচারণ করে, অসম্মান করে অথবা সত্যের অপলাপ বা অর্থহীন পোস্ট মুছে ফেলা হতে পারে এবং ব্লগারের ব্লগিং সুবিধা সাময়িক অথবা স্থায়ীভাবে স্থগিত কিংবা বাতিল করা হতে পারে”।

সচলায়তনের নীতিমালায় আছে “লেখকেরা যদিও স্বাধীন তথাপি, সচলায়তনে নিম্নোক্ত বিষয়গুলোকে জোরালো ভাবে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে: ধর্মপ্রচার......সাম্প্রদায়িক / বর্ণবাদী / লিঙ্গবাদী / অবমাননাকর লেখা ও মন্তব্য......”

এভাবে নীতিমালা দেখলে আমরা একটা ধারনা পেতে পারি, কতটা অসাম্প্রদায়িক ও গনতান্ত্রিক আমাদের বাংলা কমিউনিটি ব্লগগুলো।

ব্লগারদের নৈতিকতা ও মনোবলঃ
সাম্প্রদায়িক, স্বাধীনতা বিরোধী ও জঙ্গীবাদী শক্তিগুলো বিভিন্ন সময় বাংলা কমিউনিটি ব্লগগুলো নিয়ে তাদের ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করেছিল। তাদের অপ-মতবাদগুলো বাংলা কমিউনিটি ব্লগের মাধ্যমে প্রচার ও প্রসারের অপ-প্রয়াস নিয়েছিল। অনেক সময় মিথ্যা তথ্য দিয়ে ব্লগার মন ও মনজগতকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টায় লিপ্ত ছিল। তাদের এই অপ-প্রয়াস একাধিক নিক ফ্যাক্টারী নিয়ে কৌশোলে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অনেক দূর এগিয়েও গিয়ে ছিল। যেহুতু সামহোয়্যার ইন ব্লগ বাংলা কমিউনিটি ব্লগের মধ্যে সবচেয়ে পুরোনো ও বড় ব্লগ, তাই তাদের ষড়যন্ত্রের মূল কেন্দ্রবিন্দুই ছিল সামহোয়্যার ইন ব্লগ। কিন্তু স্বাধীনতমনষ্ক অসাম্প্রদায়িক মুক্তিযুদ্ধপন্থি ব্লগারদের অদম্য প্রতিরোধে শেষ পর্যন্ত তারা অসফল হয়ে বরং বিছিন্নভাবে বিভিন্ন ব্লগে এই প্রয়াস ক্ষুদ্র পরিসরে এখনো চালিয়ে যাচ্ছে।

সংবাদ মাধ্যমের বিকল্প উৎসঃ
ব্লগের আবেদন নিছক সামাজিকতা ও বিনোদনকে ছাপিয়ে অনেক উপরে উঠে এসেছে। কালক্রমে বাংলা ব্লগগুলো সংবাদ মাধ্যমের বিকল্প উৎস হয়ে উঠছে। জাতীয় দূর্যোগ ও ক্রান্তিকাল, এমনকি খেলাধুলার আপডেট অন্যান্য ইলেক্ট্রনিক সংবাদ মাধ্যমে আসার আগেই বাংলা ব্লগগুলোতে চলে আসছে।

গত বছর ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ এ বিডিআর বিদ্রোহের সময় বাংলা কমিউনিটি ব্লগগুলো অসাধারন ও অনন্য ভূমিকা রেখেছে। অনেক ব্লগারই জীবনের ঝুঁকি নিয়েও ঘটনাস্থলের পাশে থেকে সামগ্রিক খবর মোবাইলের মাধ্যমে ব্লগে জানিয়েছে।
আমরা একই ধারা দেখেছি এ বছরের ২৮ জানুয়ারিতে, জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর হত্যা মামলার রায় কার্যকরকে ঘিরে ব্লগারদের নিয়মিত আপডেট দিয়ে সার্বিক পরিস্থিতি আমাদের জানিয়েছেন।

সংবাদের সত্যতা নিয়ে বিতর্কঃ
অনেক সংবাদ মিডিয়াই ব্লগের এই উত্থানে ভীত হয়ে এর বিরুদ্ধে নানা অপ-প্রচার চালান। জাতির সামনে বাংলা ব্লগকে নিয়ে কুৎসা রটিয়ে যাচ্ছেন। তাদের যুক্তি ব্লগে অনেক সময় মিথ্যা ও ভিত্তিহীন সংবাদ প্রচার করা হয়। এটা কিছুটা সত্য হলেও, বহুলাংশেই মিথ্যা। যারা ব্লগিং করেন, তারা সবাই শিক্ষিত ও মার্জিত রূচীর অধীকারী। খুব সহজেই সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য বুঝতে পারেন।
তাই যারা মিথ্যা সংবাদ পরিবেশনের প্রয়াস নিবেন, অন্য ব্লগারদ্বারা অবশ্যই ধিকৃত হবেন ও প্রতিবাদের মুখে পরবেন। তাই দ্ব্যার্থহীনভাবে, বলা যায় ব্লগে পরিবেশিত অনেক সংবাদ মিথ্যা হলেও মন্তব্য আকারে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসে।

বাংলা সাহিত্য ও কমিউনিটি ব্লগঃ
সবুজপত্র পত্রিকাকে কেন্দ্র করে বাংলা সাহিত্যে যে রেঁনেসার সূত্রপাত হয়েছিল, একটি অমিত সম্ভাবনাময় সাহিত্যিক গোষ্ঠীর জন্ম হয়েছিল, যারা আমাদের বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে নিয়ে গিয়েছিলেন অনেক বড় উঁচুতে। বর্তমানে বাংলা কমিউনিটি ব্লগগুলোকে কেন্দ্র করে তেমনই রেঁনেসা শুরু হয়ে গেছে। ব্লগগুলো থেকে তৈরী হচ্ছেন অনেক প্রতিভাশীল ও অমিত সম্ভাবনাময় কবি ও সাহিত্যক।

বাংলা কমিউনিটি ব্লগগুলোকে কেন্দ্র করে প্রতিবাদী ও সাহিত্যে নব-সংযোজন লিটল ম্যাগাজিনের চর্চা চলছে। এখান থেকেও বের হয়ে আসবে অনেক প্রতিভাশালী লেখক, কবি ও সাহিত্যিক।

প্রতি বছর অমর একুশে বই মেলাকে কেন্দ্র করে বাংলা কমিউনিটি ব্লগগুলোতে পড়ে যায় সাঁজ সাঁজ রব।বিভিন্ন ব্লগ কর্তৃপক্ষ ও ব্লগারদের ব্যাক্তিগত উদ্যোগে প্রকাশিত হয় ব্লগারদের কবিতা, গল্প ও উপন্যাসের বই। এ সব পদক্ষেপই আমাদের বাংলা সাহিত্যকে নিয়ে যাবে অনেক দূর ও অনেক উচ্চতায়।

মানবিকতায় বাংলা ব্লগঃ
বাংলা কমিউনিটি ব্লগগুলো মানবিকতাবোধকে অনেক উঁচুতে নিয়ে গেছে। আর্ত্মামানবতার সেবায় ব্লগাররা যার যার অবস্থান থেকে সবাই নিষ্ঠার সাথে কাজ করে যাচ্ছেন, এগিয়ে আসছেন।
প্রায় প্রতিটি বাংলা কমিউনিটি ব্লগে অসুস্থ ও অসহায় ব্যাক্তিদের জন্য সাহায্য চেয়ে পোস্ট আসে। কর্তৃপক্ষ সেই সব পোস্টগুলোকে দ্রুত বিবেচনা করে নির্বাচিত পোস্ট বা স্টিকি পোস্টে রাখেন সবার দৃষ্টি আকর্ষনে জন্য। ব্লগাররা যার যার অবস্থান থেকে সহযোগিতায় এগিয়ে আসেন।

শীতার্তদের জন্য প্রথম আলো ব্লগের ব্লগারদের উদ্যোগ উল্ল্যেখ না করলেই নয়। যেখানেই মানবতা কষ্ট পায়, সেখানেই ব্লগারদের বিবেক আত্নদংশনে অস্থির করে তোলে সাহায্য করার তাগিদে।
রক্তের প্রয়োজনে যেকোন পোস্ট এলেই বা কারো অসুস্থতার খবর হলেই নিমিষেই ব্লগের পরিবেশ বদলে যায়। সবাই যার যার স্থান থেকে সাহায্যে এগিয়ে আসে।

ক্যান্সারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ও হাস্পাতাল নির্মানের জন্য প্রথম আলো ব্লগের ব্লগার জোহরা ফেরদৌসীর নাম না না বললেই নয়। অনেকটা একাকী ও নিষ্ঠার সাথে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন তিনি এই সংগ্রামে।

পরিশেষে এটুকুই বলব, বাংলা ব্লগগুলো আন্তর্জালের কল্পিত গণ্ডী ছেড়ে ক্রমশ জীবন্ত হয়ে উঠছে। ব্লগাররা নিজেদেরকে সামাজিক দায়িত্ববোধ ও অনুভূতি থেকেই, বিভিন্ন কল্যানমূলক ও সেবামূলক কর্মকান্ডে অংশ গ্রহন করছেন। আন্তর্জালিক আলাপচারীতা থেকে ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত হচ্ছেন একে অপরের সাথে। বিভিন্ন মীটআপ, পিকনিক, চড়ুইভাতি, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজনে অংশ নিচ্ছেন। ভালোবাসা ও মানবিকতার এক অপূর্ব বন্ধন গড়ে উঠছে চারপাশে। অনেক অচেনা কেউ হয়ে যাচ্ছে, চির চেনা একজন; এখানেই বাংলা কমিউনিটি ব্লগের স্বার্থকতা।

Thursday, February 25, 2010

শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য



শ্রীকৃষ্ণকীর্তন মধ্যযুগে রচিত বাংলা ভাষার প্রথম কাব্য গ্রন্থ। এটিই প্রথম বাংলায় রচিত কৃষ্ণকথা বিষয়ক কাব্য। মনে করা হয়, এই গ্রন্থের পথ ধরেই বাংলা সাহিত্যে বৈষ্ণব পদাবলির পথ সুগম হয়। রাধা-কৃষ্ণের প্রেম কাহিনী মানবীয়ভাবে উঠে এলেও, মূলত রাধা-কৃষ্ণকথার আড়ালে ঈশ্বরের প্রতি জীবকুলের মিলনের চরম আকুলতা প্রকাশিত হয়েছে এই কাব্যে। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের প্রধান চরিত্র তিনটি। কৃষ্ণ, রাধা, বড়ায়ি। কৃষ্ণ পরমাত্না বা ঈশ্বরের প্রতীক, রাধা জীবাত্না বা প্রাণিকুলের প্রতীক ও বড়ায়ি এই দুইয়ের সংযোগ সৃষ্টিকারী অনুঘটক।

আবিষ্কার ও নামকরণঃ
চর্যাপদের পর ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ বাংলা ভাষার দ্বিতীয় প্রাচীনতম আবিষ্কৃত নিদর্শন। ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে (১৩১৬ বঙ্গাব্দ) কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক এবং পুথিশালার অধ্যক্ষ বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার কাকিল্যা গ্রামে জনৈক দেবেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের বাড়ির গোয়ালঘর থেকে শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের পুথি আবিষ্কার করেন। ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে (১৩২৩ বঙ্গাব্দ) বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে বসন্তরঞ্জন রায়ের সম্পাদনায় পুথিটি ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ নামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়।

পুথির প্রথম দুটি ও শেষ পৃষ্ঠা পাওয়া যায় নি বলে এর নাম ও কবির নাম স্পষ্ট করে জানা যায় নি। কাব্যে বড়ু চণ্ডীদাসের তিনটি ভণিতা পাওয়া যায় – ‘বড়ু চণ্ডীদাস’, ‘চণ্ডীদাস’ ও ‘অনন্ত বড়ু চণ্ডীদাস’। এর মধ্যে ‘বড়ু চণ্ডীদাস’ ভণিতা মিলেছে ২৯৮টি স্থানে ও ‘চণ্ডীদাস’ ভণিতা মিলেছে ১০৭ বার। ৭টি পদে ব্যবহৃত ‘অনন্ত’ শব্দটি প্রক্ষিপ্ত বলেই মনে করা হয়। ডঃ মিহির চৌধুরী কামিল্যা মনে করেন, চণ্ডীদাস তাঁর নাম এবং বড়ু প্রকৃত পক্ষে তাঁর কৌলিক উপাধি বাঁড়ুজ্যে বা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অপভ্রংশ।

আবিষ্কর্তা ও সম্পাদক বসন্তরঞ্জন রায় প্রাচীন বৈষ্ণব লেখকদের ইঙ্গিত অনুসরণ করে গ্রন্থের নামকরণ করেন শ্রীকৃষ্ণকীর্তন। অবশ্য পুথিতে প্রাপ্ত একটি চিরকুটে ‘শ্রীকৃষ্ণসন্দর্ভ’ লেখা থাকায় অনেকে অনেকে গ্রন্থটিকে ‘শ্রীকৃষ্ণসন্দর্ভ’ নামকরণের পক্ষপাতী।

চণ্ডীদাসঃ
মধ্যযুগে বাংলা কাব্যে অন্তত চারজন চণ্ডীদাসের কবিতা পাওয়া যায়। এরা হলেন বড়ু চণ্ডীদাস, দ্বিজ চণ্ডীদাস, দীন চণ্ডীদাস ও চণ্ডীদাস। এই চারটি নামের মধ্যে শেষ তিনটি নাম একজনের নাকি তাঁরা পৃথক কবি তা নিশ্চিত করে আজও বলা যাচ্ছে না। এই অভূতপূর্ব সমস্যা বাংলা সাহিত্যে চণ্ডীদাস-সমস্যা নামে পরিচিত।

বড়ু চণ্ডীদাস চতুর্দশ শতকের কবি। তিনি ১৩৭০ খ্রিস্টাব্দে ছাতনা, বাঁকুড়া মতান্তরে বীরভূমের নানুর গ্রামে জন্ম গ্রহন করেন। কবির আসল নাম অনন্ত, কৌলিক উপাধি বড়ু, গুরুপ্রদত্ত নাম চণ্ডীদাস। বড়ু অন্যান্য চণ্ডীদাসদের তুলনায় প্রাচীনতম ও প্রাকচৈতন্য যুগের। তিনি বাংলা ভাষার প্রথম মানবতাবাদী কবি।

‘শুনহ মানুষ ভাই
সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপর নাই’

এই অমর মানবাতার বাণী জাত-পাতযুক্ত তৎকালীন সমাজে প্রথম কাব্যে ধারণ করেছেন অসীম সাহসের সাথে। তিনি ব্যক্তি জীবনেও ছিলেন জাত-সংস্কারের ঊর্ধে।

চণ্ডীদাস বৈষ্ণব কবি ছিলেন এবং বাশুলী দেবীর ভক্ত ছিলেন। বাশুলী মন্দিরের পুরোহিত থাকার সময় রামী নামের এক রজকিনীর প্রেমে মুগ্ধ হন। তিনি রামীর মধ্যে রাধারূপ দেখেন। জমিদার এই প্রণয়কে অবৈধ আখ্যা দিয়ে চণ্ডীদাসকে সমাজ চ্যুত ও মন্দির থেকে বিতারিত করে। তিনি আনুমানিক ১৪৩৩ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন।

শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের কাহিনিঃ
শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য তেরটি খণ্ডে রচিত। খণ্ডগুলোঃ জন্ম খণ্ড, তাম্বুল খণ্ড, দান খণ্ড, নৌকা খণ্ড, ভার খণ্ড, ছত্র খণ্ড, বৃন্দাবন খণ্ড, কালিয়দমন খণ্ড, যমুনা খণ্ড, হার খণ্ড, বাণ খণ্ড, বংশী খণ্ড, বিরহ খণ্ড।

জন্ম খণ্ডঃ
কৃষ্ণ ও রাধা উভয়ে ঈশ্বরের ইচ্ছায় মর্তে মানবরূপে জন্ম নিয়েছে। কৃষ্ণ পাপী কংস রাজাকে বধ করার জন্য দেবকী ও বাসুদেবের সন্তান হিসেবে জন্ম নেয়। কংস রাজা কৃষ্ণকে হত্যা করতে পারে এই ভয়ে, কৃষ্ণের জন্মমাত্র বাসুদেব গোপনে তাঁকে অনেক দূরে বৃন্দাবনে জনৈক নন্দ গোপের ঘরে রেখে আসে। সেখানেই দৈব ইচ্ছায় আরেক গোপ সাগর গোয়ালার স্ত্রী পদ্মার গর্ভে জন্ম নেয় রাধা। দৈব নির্দেশেই বালিকা বয়সে নপুংসক (ক্লীব) অভিমন্যু বা আইহন বা আয়ান গোপের (ঘোষের) সঙ্গে রাধার বিয়ে হয়। আয়ান গোচারণ করতে গেলে বৃদ্ধা পিসি বড়ায়িকে রাধার তত্ত্বাবধানে রাখা হয়।

তাম্বুল খণ্ডঃ
তাম্বুল অর্থ পান। রাধা ঘর থেকে বের হয়ে অন্য গোপীদের সঙ্গে মথুরাতে দই-দুধ বিক্রি করতে যায়। বড়ায়ি তাঁর সঙ্গে যায়। বৃদ্ধা বড়ায়ি পথে রাধাকে হারিয়ে ফেলে এবং রাধার রূপের বর্ণনা দিয়ে কৃষ্ণকে জিজ্ঞেস করে, এমন রূপসীকে সে দেখেছে কিনা। এই রূপের বর্ণনা শুনে রাধার প্রতি কৃষ্ণ পূর্বরাগ অনুভব করে। সে বড়ায়িকে বুঝিয়ে রাধার জন্য পান ও ফুলের উপহারসহ প্রস্তাব পাঠায়। কিন্তু বিবাহিতা রাধা সে প্রস্তাব পদদলিত করে।

দান খণ্ডঃ
দই-দুধ বিক্রির জন্য মথুরাগামী রাধা ও গোপীদের পথ রোধ করে কৃষ্ণ। তার দাবী নদীর ঘাটে পারাপার-দান বা শুল্ক দিতে হবে, তা না হলে রাধার সঙ্গে মিলিত হতে দিতে হবে। রাধা কোনোভাবেই এ প্রস্তাবে রাজী হয় না। এ দিকে তাঁর হাতেও কড়ি নেই। সে নিজের রূপ কমাবার জন্য চুল কেটে ফেলতে চাইল; কৃষ্ণের হাত থেকে বাঁচবার জন্য বনে দৌড় দিল। কৃষ্ণও পিছু ছাড়বার পাত্র নয়। অবশেষে কৃষ্ণের ইচ্ছায় কর্ম হয়।

নৌকা খণ্ডঃ
এরপর থেকে রাধা কৃষ্ণকে এড়িয়ে চলে। কৃষ্ণ নদীর মাঝির ছদ্মবেশ ধারণ করে। একজন পার করা যায় এমন একটি নৌকাতে রাধাকে তুলে সে মাঝ নদীতে নিয়ে নৌকা ডুবিয়ে দেয় এবং রাধার সঙ্গ লাভ করে। নদী তীরে উঠে লোকলজ্জার ভয়ে রাধা সখীদের বলে যে, নৌকা ডুবে গিয়েছে, কৃষ্ণ না থাকলে সে নিজেও মরত, কৃষ্ণ তাঁর জীবন বাঁচিয়েছে।

ভার খণ্ডঃ
শরৎকাল। শুকনো পথ ঘাটে হেঁটেই মথুরাতে গিয়ে দই-দুধ বিক্রি করা যায়। কিন্তু রাধা আর বাড়ির বাইরে আসে না। শাশুড়ি বা স্বামীকে সে আগের ঘটনাগুলো ভয়ে ও লজ্জায় খুলে বলে নি। এদিকে রাধা অদর্শনে কৃষ্ণ কাতর। সে বড়ায়িকে দিয়ে রাধার শাশুড়িকে বোঝায়, ঘরে বসে থেকে কি হবে, রাধা দুধ-দই বেচে কটি পয়সা তো আনতে পারে। শাশুড়ির নির্দেশে রাধা বাইরে বের হয়। জিন্তু প্রচণ্ড রোদে কোমল শরীরে দই-দুধ বহন করতে গিয়ে সে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। এই সময়ে কৃষ্ণ ছদ্মবেশে মজুরী করতে আসে। পরে ভার বহন অর্থাৎ মজুরির বদলে রাধার আলিঙ্গন কামনা করে। রাধা এই চতুরতা বুঝতে পারে। সেও কাজ আদায়ের লক্ষ্যে মিথ্যা আশ্বাস দেয়। কৃষ্ণ আশায় আশায় রাধার পিছু পিছু ভার নিয়ে মথুরা পর্যন্ত চলে।

ছত্র খণ্ডঃ
দুধ-দই বেচে এবার মথুরা থেকে ফেরার পালা। কৃষ্ণ তাঁর প্রাপ্য আলিঙ্গন চাইছে। রাধা চালাকি করে বলে, ‘এখনো প্রচণ্ড রোদ। তুমি আমাদের ছাতা ধরে বৃন্দাবন পর্যন্ত চলো। পরে দেখা যাবে’। কৃষ্ণ ছাতা ধরতে লজ্জা ও অপমান বোধ করছিল। তবুও আশা নিয়ে ছাতা ধরেই চলল। কিন্তু তাঁর আশা পূর্ন করেনি রাধা।

বৃন্দাবন খণ্ডঃ
রাধার বিরুদ্ধ মনোভাব কৃষ্ণকে ভাবান্তর ঘটায়। সে অন্য পথ অবলম্বন করে। নিজে কটু বাক্য বলে না, দান বা শুল্ক আদায়ের নামে বিড়ম্বনা করে না, বরং বৃন্দাবনকে অপূর্ব শোভায় সাজিয়ে তুলল। রাধা ও গোপীরা সেই শোভা দর্শন করে কৃষ্ণের উপর রাগ ভুলে যায়। তাঁরা পরিবর্তিত কৃষ্ণকে দেখতে আগ্রহ দেখায়। কৃষ্ণ সব গোপিকে দেখা দেয়। পরে রাধার সঙ্গে তাঁর দর্শন ও মিলন হয়।

কালিয়দমন খণ্ডঃ
যমুনা নদী বৃন্দাবনের উপর দিয়ে প্রবাহিত। সেখানে কালিয়নাগ বাস করে। তার বিষে সেই জল বিষাক্ত। কৃষ্ণ কালিয়নাগকে তাড়াতে নদীর জলে ঝাঁপ দেন। দৈব ইচ্ছায় ও কৃষ্ণের বীরত্বে কালিয়নাগ পরাস্ত হয় এবং দক্ষিন সাগরে বসবাস করতে যায়। কালিয়নাগের সঙ্গে কৃষ্ণ যখন জলযুদ্ধে লিপ্ত, তখন রাধার বিশেষ কাতরতা প্রকাশ পায়।

যমুনা খণ্ডঃ
রাধা ও গোপীরা যমুনাতে জল আনতে যায়। কৃষ্ণ যমুনার জলে নেমে হটাৎ ডুব দিয়ে আর উঠে না। সবাই মনে করে কৃষ্ণ দুবে গেছে। এদিকে কৃষ্ণ লুকিয়ে কদম গাছে বসে থাকে। রাধা ও সখীরা জলে নেমে কৃষ্ণকে খুঁজতে থাকে। কৃষ্ণ নদী তীরে রাধার খুলে রাখা হার চুরি করে আবার গাছে গিয়ে বসে।

হার খণ্ডঃ
পরে কৃষ্ণের চালাকি রাধা বুঝতে পারে। হার না পেয়ে রাধা কৃষ্ণের পালিতা মা যশোদার কাছে নালিশ করে। কৃষ্ণও মিথ্যে বলে মাকে। সে বলে, আমি হার চুরি করব কেন, রাধাতো পাড়া সম্পর্কে আমার মামি। এদিকে বড়ায়ি সব বুঝতে পারে এবং রাধার স্বামী আয়ান হার হারানোতে যাতে রাগান্বিত বা ক্ষুব্ধ না হয় সেজন্য বলে যে, বনের কাঁটায় রাধার গজমোতির হার ছিন্ন হয়ে হারিয়ে গেছে।

বাণ খণ্ডঃ
মায়ের কাছে নালিশ করায় কৃষ্ণ রাধার উপর ক্ষুব্ধ। রাধাও কৃষ্ণের প্রতি প্রসন্ন নয়। বড়ায়ি বুদ্ধি দিল, কৃষ্ণ যেন শক্তির পথ পরিহার করে মদনবাণ বা প্রেমে রাধাকে বশীভূত করে। সে মতো কৃষ্ণ পুষ্পধনু নিয়ে কদমতলায় বসে। রাধা কৃষ্ণের প্রেমবাণে মূর্চ্ছিত ও পতিত হয়। এরপর কৃষ্ণ রাধাকে চৈতন্য ফিরিয়ে দেয়। রাধা কৃষ্ণপ্রেমে কাতর হয়ে কৃষ্ণকে খুঁজে ফেরে।

বংশী খণ্ডঃ
রাধাকে আকৃষ্ট করার জন্য সময়-অসময়ে কৃষ্ণ বাঁশিতে সুর তোলে। কৃষ্ণের বাঁশি শুনে রাধার রান্না এলোমেলো হয়ে যায়, মন কুমারের চুল্লির মতো পুড়তে থাকে, রাত্রে ঘুম আসে না, ভোর বেলা কৃষ্ণ অদর্শনে রাধা মূর্চ্ছা যায়। বড়ায়ি রাধাকে পরামর্শ দেয়, সারারাত বাঁশি বাজিয়ে সকালে কদমতলায় কৃষ্ণ বাঁশি শীয়রে রেখে ঘুমায়। তুমি সেই বাসি চুরি কর, তাহলেই সমস্যার সমাধান হবে। রাধা তাই করে। কৃষ্ণ বুদ্ধিমান। বাঁশি চোর কে তা বুঝতে তাঁর কোনো কষ্ট হয় না। রাধা কৃষ্ণকে বলে, বড়ায়িকে সাক্ষী রেখে কৃষ্ণকে কথা দিতে হবে যে, সে কখনো রাধার কথার অবাধ্য হবে না ও রাধাকে ত্যাগ করে যাবে না, তাহলেই বাঁশির সন্ধান মিলতে পারে। কৃষ্ণ কথা দিয়ে বাঁশি ফিরে পায়।

বিরহ খণ্ডঃ
কৃষ্ণ তারপরও রাধার উপর উদাসীন। এদিকে মধুমাস সমাগত।রাধা বিরহ অনুভব করে। রাধা বড়ায়িকে কৃষ্ণকে এনে দিতে বলে। দই-দুধ বিক্রির ছল করে রাধা নিজেও কৃষ্ণকে খুঁজতে বের হয়। অবশেষে বৃন্দাবনে বাঁশি বাজানো অবস্থায় কৃষ্ণকে খুঁজে পাওয়া যায়। কৃষ্ণ রাধাকে বলে, ‘তুমি আমাকে নানা সময় লাঞ্ছনা করেছো, ভার বহন করিয়েছো, তাই তোমার উপর আমার মন উঠে গেছে’। রাধা বলে, ‘তখন আমি বালিকা ছিলাম, আমাকে ক্ষমা করো। আমি তোমার বিরহে মৃতপ্রায়। তির্যক দৃষ্টি দিলেও তুমি আমার দিকে তাকাও’। কৃষ্ণ বলে, ‘বড়ায়ি যদি আমাকে বলে যে তুমি রাধাকে প্রেম দাও, তাহলে আমি তোমার অনুরোধ রাখতে পারি’। অবশেষে বড়ায়ি রাধাকে সাজিয়ে দেয় এবং রাধা কৃষ্ণের মিলন হয়। রাধা ঘুমিয়ে পড়লে কৃষ্ণ নিদ্রিত রাধাকে রেখে কংসকে বধ করার জন্য মথুরাতে চলে যায়। ঘুম থেকে উঠে কৃষ্ণকে না দেখে রাধা আবার বিরহকাতর হয়। রাধার অনুরোধে বড়ায়ি কৃষ্ণের সন্ধানে যায় এবং মথুরাতে কৃষ্ণকে পেয়ে অনুরোধ করে, ‘রাধা তোমার বিরহে মৃতপ্রায়। তুমি উন্মাদিনীকে বাঁচাও’। কিন্তু কৃষ্ণ বৃন্দাবনে যেতে চায় না, রাধাকে গ্রহন করতে চায় না। কৃষ্ণ বলে, ‘আমি সব ত্যাগ করতে পারি, কিন্তু কটু কথা সহ্য করতে পারি না। রাধা আমাকে কটু কথা বলেছে’। (‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ কাব্য এখানে ছিন্ন। পৃষ্ঠা পাওয়া না যাওয়ায়, এ কাব্যের সমাপ্তি কেমন তা জানা যায় নি।)

সূত্রঃ
১. উইকিপিডিয়া
২. ড. সৌমিত্র শেখর, বাংলা দর্পন।

Tuesday, January 26, 2010

মনসামঙ্গল কাব্য

মঙ্গল কাব্যধারার সবচেয়ে জনপ্রিয় কাব্য মনসামঙ্গল। সর্পদেবী মনসার মাহাত্ন্য, স্তুতি ও কাহিনি নিয়ে রচিত মনসামঙ্গল। একে মনসাবিজয় বা পদ্মপুরাণ নামেও অভিহিত করা হয়। আবহমান কাল থেকেই বাংলাদেশ নদীনালা, খালবিল, জলাশয়ে ভরা। গ্রাম বাংলার সর্প ভয়ে ভীত সাধারণ মানুষের কাছে মনসামঙ্গল শ্রী চৈতন্যপূর্ব যুগ থেকেই ব্যপকভাবে সমাদৃত। চাঁদ সওদাগরের প্রথম দিকে মনসা বিরূপতা, পরে মনসা দেবীর অলৌকিক শক্তির প্রভাব স্বীকার করে তার বশ্যতা মেনে পূজো দেওয়াই এই কাব্যের প্রধান আখ্যান হলেও, এর মাঝে বাংলার প্রাকৃতিক জীবন, লৌকিক জীবনাচার উঠে এসেছে। চাঁদ সওদাগর, বেহুলা, লখিন্দর যেন আমাদের খুব কাছের কেউ, আমাদেরই একজন। চাঁদ সওদাগরের পুত্র বাৎসল্য, বেহুলার পতিপ্রেম অতি মানবীয়ভাবে উঠে এসেছে এই কাব্যে।

কানা হরিদত্ত মনসামঙ্গল কাব্যের আদি কবি। এছাড়াও বিজয়গুপ্ত, বিপ্রদাস পিপিলাই, দ্বিজ বংশীদাস, কেতকাদাস ক্ষেমানন্দ প্রমুখ মনসামঙ্গল কাব্য রচনা করেছেন।

বিপ্রদাস পিপিলাই এর মনসামঙ্গল কাব্যের কাহিনী সংক্ষেপ

হিন্দু পূরাণ অনুসারে, চাঁদ সওদাগর ছিলেন শিবের একজন একনিষ্ঠ অনুসারী, তবে মনসা তাকে নিজস্ব পূজারী করার পরিকল্পনা করে। মনসা তার সকল কলাকৌশল অবলম্বন করে চাঁদ সওদাগরের মত বদলানোর চেষ্টা করলেও চাঁদ সওদাগর শিবের কাছ থেকে দিক্ষা পাওয়া মন্ত্র ও বেদবাক্য দিয়ে নিজেকে রক্ষা করে। একসময় মনসা চাঁদ সওদাগরের কাছে সুন্দরী নারীর বেশে এসে হাজির হলে চাঁদ সওদাগর তাকে তার গোপন কথা জানিয়ে দেয়। ফলে, চাঁদ তার বেদবাক্যের ফলে প্রাপ্ত অলৌকিক ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। চাঁদ এরপর শঙ্করের সাহায্য গ্রহণ করে। পূর্ণশক্তির ক্ষমতা চাঁদ সওদাগরের চেয়েও বেশি হলেও মনসা তাকে হত্যা করে চাঁদ সওদাগরকে পুনরায় অসহায় করে ফেলে।

এরপরও চাঁদ সওদাগর মনসার পূজা করতে অস্বীকৃতি জানালে মনসা সাপ পাঠিয়ে তার ছয় সন্তানকে হত্যা করে। ফলে, চাঁদ সওদাগর হতাশ হয়ে তার ব্যবসা করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। প্রতিকূল পরিস্থিত স্বত্ত্বেও চাঁদ ব্যবসার উদ্দেশে আবার সমুদ্র যাত্রা শুরু করে। একটি সফল ব্যবসায়িক অভিযানের পর জাহাজভর্তি সম্পদ নিয়ে চাঁদ ঘরে ফেরার জন্য যাত্রা শুরু করে। মনসা একটি ঝড় উত্পন্ন করে এবং চাঁদ প্রথমিক পর্যায়ে দূর্গার সাহায্য নিয়ে রক্ষা পেলেও পরবর্তীতে মনসার অনুরোধের প্রেক্ষিতে শিব দূর্গাকে সরে যেতে বলে। এরপর চাঁদ সওদাগরের জাহাজ ডুবে যায় এবং মনসা তাকে একটি দ্বীপে নিয়ে আসে। এই দ্বীপে চাঁদ তার পুরনো বন্ধু চন্দ্রকেতুর দেখা পায়।

চন্দ্রকেতু চাঁদ সওদাগরকে মনসার অনুসারী করার আপ্রাণ চেষ্টা করলেও সে দৃঢ়ভাবে তা প্রত্যাখ্যান করে। সে ভিক্ষুকে পরিণত হয়েও কেবল শিব আর দূর্গার পূজা করতে থাকে। মনসার কাছে মাথা না নোয়াতে চাওয়ায় সে তার স্বর্গের দুই বন্ধু - দু'জন অপ্সরার সাহায্য গ্রহণ করে। তারা পৃথিবীতে মানব হিসেবে জন্ম নিতে রাজি হয়। একজন চাঁদ সওদাগরের পুত্র ও অন্যজন চাঁদের ব্যবসায়িক সতীর্থ সাহার কন্যা হিসেবে জন্মগ্রহণ করে।

চম্পকনগরে ফিরে এসে চাঁদ সওদাগর তার জীবন নতুন করে গড়তে সমর্থ হয়। তার একটি সন্তান জন্ম লাভ করে। তারা সন্তানটির নাম রাখে লখিন্দর। কাছাকাছি সময়ে সাহার স্ত্রী একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দেয় যার নাম রাখা হয় বেহুলা। দুটি শিশুই একসাথে বেড়ে ওঠে এবং একে অপরের জন্য সম্পুর্ণ উপযুক্ত বলে গণ্য হয়। তবে যখন তাদের রাশি গণণা করা হয় এবং দেখা যায় যে, বিয়ের রাতে লখিন্দর সাপের কামড়ে মৃত্যুবরণ করবে। যেহেতু উভয়ই তখন মনসার অনুসারী এবং তাদের ভেতরে প্রচুর সাদৃশ্য তাই তাদের বিবাহ নির্ধারিত হয়। চাঁদ সওদাগর অতিরিক্ত সতর্কতা হিসেবে এমন বাসর ঘর তৈরি করেন যা সাপের পক্ষে ছিদ্র করা সম্ভব নয়।

কিন্তু সকল সাবধানতা স্বত্ত্বেও মনসা তার উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে সমর্থ হয়। তার পাঠানো একটি সাপ লখিন্দরকে হত্যা করে। প্রচলিত প্রথা অনুসারে যারা সাপের দংশনে নিহত হত তাদের স‌ৎকার প্রচলিত পদ্ধতিতে না করে তাদের মৃতদেহ ভেলায় করে নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হত এ আশায় যে ব্যক্তিটি হয়ত কোন অলৌকিক পদ্ধতিতে ফিরে আসবে। বেহুলা সবার বাঁধা অগ্রাহ্য করে তার মৃত স্বামীর সাথে ভেলায় চড়ে বসে। তারা ছয় মাস ধরে যাত্রা করে এবং গ্রামের পর গ্রাম পাড়ি দিতে থাকে। এই অবস্থায় মৃতদেহ পঁচে যেতে শুরু করে এবং গ্রামবাসীরা তাকে মানসিক ভারসাম্যহীন মনে করতে থাকে। বেহুলা মনসার কাছে প্রার্থনা অব্যাহত রাখে। তবে মনসা ভেলাটিকেই কেবল ভাসিয়ে রাখতে সাহায্য করে।

একসময় ভেলাটি মনসার পালক মাতা নিতার কাছে আসে। তিনি নদীতীরে ধোপার কাজ করার সময় ভেলাটি ভূমি স্পর্শ করে। তিনি মনসার কাছে বেহুলার নিরবচ্ছিন্ন প্রার্থনা দেখে বেহুলাকে তার কাছে নিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি তার ঐশ্বরিক ক্ষমতাবলে চোখের পলকে বেহুলা ও মৃত লখিন্দরকে স্বর্গে পৌছে দেন। মনসা বলে, তুমি তাকে (লখিন্দরকে) ফিরে পাবার যোগ্য, কিন্তু এটি কেবলি সম্ভব হবে যদি তুমি তোমার শ্বশুর়কে আমার পূজারী করতে পার।

"আমি পারব", বেহুলা জবাব দেয় এবং সেই সাথেই তার স্বামীর মৃতদেহে জীবন ফিরে আসতে শুরু করে। তার ক্ষয়ে যাওয়া মাংস ফিরে আসে এবং লখিন্দর তার চোখ মেলে তাকায়। এরপর লখিন্দর বেহুলার দিকে তাকিয়ে হাসে।

তাদের পথপ্রদর্শক নিতাকে নিয়ে তারা পৃথিবীতে ফিরে আসে। বেহুলা তার শ্বাশুরীর কাছে সবকিছু খুলে বলে। তিনি চাঁদ সওদাগরের কাছে গিয়ে তাকে এ সম্পর্কে অবহিত করেন। চাঁদ সওদাগর আর মনসাকে না বলতে পারেনি।

চাঁদ সওদাগর মনসাকে প্রতি মাসের অমাবস্যার এগার তারিখে মনসা পূজা করে। তবে দেবীর দেয়া সকল কষ্টের জন্য তাকে সে ক্ষমা করতে পারে না। সে তার প্রতিকৃতি থেকে মুখ সরিয়ে বাম হাতে তাকে ফুল প্রদান করে। তবে সেজন্য মনসা তার উপর আর কোন আক্রোশ রাখে না। তখন থেকে চাঁদ সওদাগর ও তার পরিবার সুখে ও সমৃদ্ধিতে বসবাস করতে থাকে। চাঁদ সওদাগরের মর্যাদা ও সম্মান পুনর্প্রতিষ্ঠিত হয় এবং মনসাকে পূজা করা সাধারণভাবে গ্রহণযোগ্য ও সম্মানীয় বলে বিবেচিত হতে থাকে।

কেতকাদাস ক্ষেমানন্দ
পশ্চিমবঙ্গবাসী মনসামঙ্গল কাব্য রচয়িতাদের মধ্যে কেতকাদাস ক্ষেমানন্দ সর্বশ্রেষ্ঠ। ‘ক্ষেমানন্দ’ তাঁর প্রকৃত নাম এবং ‘কেতকাদাস’ তাঁর উপাধী। মনসাদেবীর পরম ভক্ত বলে কবি কোথাও কোথাও নিজেকে ‘কেতকাদাস’ বলেছেন। কেতকাদাস ক্ষেমানন্দ বর্ধমান জেলার কাঁদড়া গ্রামের অধিবাসী এবং জাতিতে কায়স্থ ছিলেন।নানা প্রকার অশান্তির দরুন তিঁনি দেশত্যাগ করেন। বিচিত্র পরিবেশ ও অবস্থার মধ্যে কবির বাল্যকাল কাটে। কবির কাব্য রচনাকালের কোনো স্পস্ট উল্লেখ নেই। সপ্তদশ শতাব্দীর কোনো এক সময়ে তিঁনি কাব্য রচনা করে থাকবেন।

মনসামঙ্গল
কেতকাদাস ক্ষেমানন্দ


মনসা কর্তৃক চাঁদ সদাগরের সপ্তডিঙা ডুবাইবার মন্ত্রণা

চম্পক নগরে ঘর চাঁদ সদাগর ।
মনসা সহিত বাদ করে নিরন্তর ।।
দেবীর কোপেতে তার ছয় পুত্র মরে ।
তথাচ দেবতা বলি না মানে তাঁহারে ।।
মনস্তাপ পায় তবু না নোয়ায় মাথা ।
বলে চেঙমুড়ী বেটী কিসের দেবতা ।।
হেতাল লইয়া হস্তে দিবানিশি ফেরে ।
মনসার অন্বেষণ করে ঘরে ঘরে ।।
বলে একবার যদি দেখা পাই তার ।
মারিব মাথায় বাড়ি না বাঁচিবে আর ।।
আপদ ঘুচিবে মম পাব অব্যাহতি ।
পরম কৌতুকে হবে রাজ্যেতে বসতি ।।
এইরূপে কিছু দিন করিয়া যাপন ।
বাণিজ্যে চলিল শেষে দক্ষিণ পাটন ।।
শিব শিব বলি যাত্রা করে সদাগর ।
মনের কৌতুকে চাপে ডিঙ্গার উপর ।।
বাহ বাহ বলি ডাক দিল কর্ণধারে ।
সাবধান হয়ে যাও জলের উপরে ।।
চাঁদের আদেশ পাইয়া কাণ্ডারী চলিল ।
সাত ডিঙ্গা লয়ে কালীদহে উত্তরিল ।।
চাঁদবেনের বিসম্বাদ মনসার সনে ।
কালীদহে সাধু দেবী জানিল ধেয়ানে।।
নেতা লইয়া যুক্তি করে জয় বিষহরী ।
মন সনে বাদ করে চাঁদ অধিকারী ।।
নিরন্তর বলে মোরে কানী চেঙমুড়ী ।
বিপাকে উহারে আজি ভরা ডুবি করি ।।
তবে যদি মোর পূজা করে সদাগর ।
অবিলম্বে ডাকিল যতেক জলধর ।।
হনুমান বলবান পরাৎপর বীর ।
কালীদহে কর গিয়ে প্রবল সমীর ।।
পুষ্প পান দিয়া দেবী তার প্রতি বলে ।
চাঁদবেনের সাত ডিঙ্গা ডুবাইবে জলে ।।
দেবীর আদেশ পাইয়া কাদম্বিনী ধায় ।
বিপাকে মজিল চাঁদ কেতকাতে গায় ।।

গদ্যান্তরঃ
চম্পক নগরে চাঁদ সদাগরের বাস। সর্পদেবী মনসার সঙ্গে তাঁর চিরকালীন বিবাদ। দেবীর রোষে মারা গেছে চাঁদের ছয় পুত্র। বিস্তর শোকতাপ পেয়েছেন। তবুও দেবতা বলে মানেননি মনসাকে। “চ্যাঙমুড়ি বেটি আবার কিসের দেবতা!” দিনরাত হেতালের ডাল হাতে ঘরে ঘরে মনসার সন্ধান করে ফেরেন আর বলেন, “একবার যদি দেখা পাই তার, এই লাঠির বাড়ি মাথায় মেরে মেরেই ফেলব তাকে। আপদ ঘুচবে আমার। অব্যাহতি পাবো। তখন সুখে শান্তিতে বাস করতে পারব রাজ্যে।”
এইভাবে কিছুদিন কাটার পর শেষে চাঁদ স্থির করলেন যে বাণিজ্যে যাবেন দক্ষিণ দেশে। মনের আনন্দে ডিঙায় চেপে ‘শিব শিব’ বলে যাত্রা করলেন। “বাহ বাহ,” ডাক দিলেন কাণ্ডারীকে, “সাবধান হয়ে যাও জলের উপরে।” কাণ্ডারীও চাঁদের আদেশ পেয়ে এগিয়ে চলল। সপ্তডিঙা উপস্থিত হল কালীদহে।

এদিকে ধ্যানযোগে বিষহরী মনসা জানতে পারলেন, সাধু চাঁদ সদাগর কালীদহে। অমনি বসলেন সখি নেতার সঙ্গে মন্ত্রণা করতে, “চাঁদ সদাগর কেবল বিবাদই করে আমার সঙ্গে। শুধু বলে চেঙমুড়ি কানি। এইবেলা দুর্বিপাকে তার ভরাডুবি করি। তবে যদি সে আমার পূজা করে।” এই বলে মনসা আহ্বান করলেন আকাশের মেঘের দলকে। আহ্বান করলেন মহাবীর হনুমানকে। পবননন্দনের হাতে পুষ্প ও পান দিয়ে অনুরোধ করলেন, “তুমি গিয়ে কালীদহে প্রবল বাতাস বইয়ে দাও। চাঁদ বণিকের সপ্ত ডিঙা জলে ডোবাও।” দেবীর আদেশ পেয়ে উড়ে চলল মেঘের দল। চাঁদের মাথার উপর তখন বিপদের কালো ছায়া।


চাঁদের নৌকাডুবি

দেবীর আজ্ঞায় হনুমান ধায়
সাথে লয়ে মেঘগণ।
পুষ্কর দুষ্কর আইল সত্বর
করি ঝড় বরিষণ ।।
আসি কালীদয় উভয়েই কয়
ডুবাইতে সাধুর তরী।
বীর হনুমান অতি বেগে যান
করিবার ঝড় বারি ।।
অবনী আকাশে প্রখর বাতাসে
হৈল মহা অন্ধকার।
গৈঁঠার গাবর নায়ের নফর
নাহিক দেখে নিস্তার ।।
গজ শুণ্ডাকার পড়ে জলধার
ঘন ঘোর তর্জনে গর্জে।
মনে পাইয়া ডর বলে সদাগর
যাইতে নারিলাম রাজ্যে ।।
হুড় হুড় হুড় পড়িছে চিকুর
যেন বেগে ধায় গুলি।
বলে কর্ণধার নাহিক নিস্তার
ভাঙ্গিল মাথার খুলি ।।
দেখিবে অদ্ভুত খেলিছে বিদ্যুৎ
ছাইল গগনে ভানু
বিপদ গণিয়া বলিছে কান্দিয়া
কেন বা বাণিজ্যে আইনু ।।
তরী সাতখান চাপি হনুমান।
চক্রাবর্তে দেয় পাক।
ঘন ঘন ঝড়ে ছই গেল উড়ে
প্রবল পবন ডাক ।।
হাঙ্গর কুম্ভীর আসিয়া বিস্তর
তরী আশে পাশে ভাসে।
জলে ডিঙ্গা লয়ে, রাখে পাক দিয়ে
অহি ধায় গ্রাস আশে ।।
বিপদ ঘটালে কালীদ উথলে
তরঙ্গে তরণী বুড়ে।
হইয়া বিকল কান্দিয়া সকল
জলে ঝাঁপ দিয়া পড়ে ।।
মেঘের গর্জনে আর বরিষণে
কাণ্ডারী কাঁপিছে শীতে।
শক্তি নাহি নড়ে মূর্ছাগত পড়ে
সবে রহে এক ভিতে ।।
ডিঙ্গার নফরে গ্রাসিল হাঙ্গরে
কাছি তার গিলে মাছে ।
চাপিয়া তরণী হনুমান আপনি
হেলায় দোলায়ে নাচে ।।
ঘন পড়ে ঝঞ্ঝনা ভাসিল ফাতনা
ভেসে গেল কালীদহ জলে ।
ডিঙ্গা হৈল ডুবু ডুবু মনসার নাম তবু
সদাগর মুখে নাহি বলে ।।
যা করেন শিবশূল এবারে পাইলে কূল
মনসাকে বধিব প্রাণে।
যত বলে বেনিয়া এই সব শুনিয়া
কোপে জ্বলে বীর হনুমানে ।।
করি তবে হুড়মুড় তুলিল প্রবল ঝড়
হনুমান বাড়িল যে বলে।
মতিগতি মনসার ঘা মারিয়া পদের
সাত ডিঙ্গা ডুবাইল জলে ।।
কান্দয়ে বাঙ্গাল হইনু কাঙ্গাল
ভেসে গেল পোস্তের হোলা।
বিপদ সাগরে জলের উপরে
ভাসিয়া নিদান বেলা ।।
ডুবাইয়া নায় চাঁদ জল খায়
বিষহরী খলখল হাসে।
জয় জয় মনসা তুমি মা ভরসা
রচিলেক কেতকা দাসে ।।

গদ্যান্তরঃ
দেবীর আজ্ঞায় অনুগত মেঘের দল সঙ্গে নিয়ে উড়ে চলল হনুমান। সঙ্গে চলল দুই মেঘ পুষ্কর আর দুষ্কর। ঝড়-বাদল নিয়ে হাজির হল তারা কালীদহে। সঙ্গে সঙ্গে প্রবল বাতাস বইতে শুরু করল। মেঘে মেঘে অন্ধকার হয়ে গেল আকাশ। জলের ধারা হাতির শুঁড়ের মতো ভীষণ গর্জন করতে করতে আছড়ে পড়তে লাগল নৌকার উপর। তাই দেখে নৌকার দাঁড়ি মাঝি থেকে চাকরবাকর সকলেই ভয় পেয়ে গেল। ভয় জাগল চাঁদের মনেও। “আর বুঝি রাজ্যে ফেরা হবে না,” তিনি বলতে লাগলেন। এদিকে গুলি ছোটার মতো হুড়মুড় শব্দে বাজ পড়ছে। ঢাকা পড়ে গেছে সূর্য। কাণ্ডারী চিৎকার করে বলছে, “আর নিস্তার নেই ! আজই উড়ে যাবে মাথার খুলি !” মাল্লারা কেঁদে বলছে, “কেনই বা বাণিজ্যে এলাম !” এমন সময় সাতখানা নৌকার মাথায় চড়ে পাক দিতে লাগল হনুমান। বাতাস গর্জন করতে করতে উড়িয়ে দিল নৌকার ছই। ডুবন্ত নাওয়ের ধারে খাদ্যের লোভে এসে জুটতে লাগল যত হাঙর, কুমির আর সাপ। এদিকে ঢেউ আছড়ে পড়ছেই। নৌকা হাবুডুবু। মেঘের গর্জনে আর শীতে থরথর করে কাঁপতে লাগল কাণ্ডারী। ডিঙার চাকরবাকররা একে একে হাঙরের পেটে যেতে লাগল। কাছি ছিঁড়ে গেল মাছের পেটে। বাজ পড়ল ফাতনার উপর। সেটা ছিড়ে গেল ভেসে। তবু চাঁদ একটিবারের জন্যেও উচ্চারণ করলেন না মনসার নাম। “যা করেন শিব শূলপাণি,” বললেন চাঁদ, “তবে এবার কুল পেলে মনসার প্রাণ নির্ঘাত নেব।” এসব শুনে মনসার দাস হনুমানের সারা শরীর জ্বলতে লাগল রাগে। পায়ের এক চাপে সে ডুবিয়ে দিল নৌকা। পোস্তের মালসা ভেসে গেল জলে। বাঙালরা হাহুতাশ করে উঠল। জলে পড়ে হাবুডুবু খেতে লাগলেন চাঁদও। আর তাই দেখে খলখল করে হেসে উঠলেন মনসা।


চাঁদের দুর্জয় মনোবল

ধুয়া। হুড়ুর বাফৈ বাফৈ
লম্ফ দিয়া বহিত্রে চাপিল হনুমান।
চক্রাবর্তে ঘোরে ডিঙ্গা সাধু কম্পমান।।
শিরে হস্ত দিয়া কান্দে সকল বাঙ্গাল।
সকল ডুবিনু জলে হইনু কাঙ্গাল ।।
পোস্তের হোলা ভেসে গেল ছাকিনার কানি।
আর বাঙ্গাল বলে গেল ছেঁড়া কাঁথাখানি।।
ধুলায়ে লোটায়ে কান্দে যত বাঙ্গালেরা।
সাত গেঁটে টেনা তার হয় জ্ঞানহারা ।।
বিপাকে হারানু প্রাণ চাঁদবেনের পাকে।
ডাকাচুরি নহে ভাই কব গিয়া কাকে।।
যতেক বাঙ্গাল তারা দিকে দিকে ধায়।
মনসার হটে চাঁদবেনে জল খায় ।।
চক্ষু রাঙ্গা ভরে পেট খাইয়া চুবানি।
তবু বলে দুঃখ দিলি চেঙমুড়ী কানী।।
শুনিয়া হাসেন রথে জয় বিষহরী।
ঢোকে ঢোকে জল খায় চাঁদ অধিকারী ।।
সাধুর দুর্গতি দেখি মনসা ভাবিয়া।
বসিবারে শতদল দিল ফোলাইয়া।।
জল খাইয়া রক্তচক্ষু নাহি দেখে কূল।
হেনকালে সম্মুখে দেখিল পদ্মফুল ।।
চাঁদ বলে ঐ পদ্ম মনসায় জন্ম।
হেন পদ্ম পরশিলে আমার অধর্ম।।
এত ভাবি চাঁদবেনে না ছুঁইল ফুল।
জল খাইয়া মরে প্রাণে নাহি দেখে কূল ।।
সাধুর দুর্গতি দেখি জগাতী কমলা।
রামকলা কাটিয়া চাঁদেরে দিল ভেলা।।
ভেলায় চাপিয়া সাধু পাইল গিয়া তড়।
শিব শিব বলি সাতবার করে গড় ।।
লজ্জা ভয়-পাকে রয় জলেতে বসিয়া।
নেত সে ধোপানী তবে বলিল হাসিয়া।।
নেত বলে চাঁদবেনে তোমা নাহি জানে।
এবার সঙ্কটে ওরে রাখো গো মা প্রাণে ।।
বস্ত্র বিবর্জিত সাধু কাতর হৃদয়।
মনসার পাদপদ্মে কেতকাতে গায় ।।

গদ্যান্তরঃ
হনুমান তো লম্ফ দিয়ে চাপল নৌকায়। আর সাধুর নৌকাও তার সঙ্গে কাঁপতে কাঁপতে খেতে লাগল চরকিপাক। আর তাই না দেখে নৌকার বাঙাল মাল্লারা তো ধুলোয় লুটিয়ে পড়ে কাঁদতে লাগল। বলতে লাগল, “সব কিছুই তো জলে ভেসে গেল, আমরা যে কাঙাল হলাম। পোস্তের মালসাগুলো ছাকনির কাপড়ের মতো জলের তোড়ে কোথায় চলে গেল! টুকরো টুকরো হয়ে গেল পরনের কাপড়। ওই চাঁদবেনের পাকে পড়ে আমরাও প্রাণ হারালাম। এতো চুরি-ডাকাতি নয়, যে প্রতিকার চাওয়া যাবে কারোর থেকে।” এই বলে তারা সব এদিক ওদিক ভেসে যেতে লাগল।
এদিকা মনসার কূটচালে হাবুডুবু খেতে লাগলেন চাঁদ। জল খেয়ে খেয়ে তাঁর চোখ লাল হয়ে গেল। তবু বলতে লাগলেন, “দুঃখ দিলি চেঙমুড়ি কানি।” রথে বসে সে কথা শুনে হেসে ফেললেন বিষহরী মনসা। চাঁদের বসার জন্য তিনি পদ্ম ফুটিয়ে দিলেন একখানা। অকূল সমুদ্রে কূলহারা চাঁদ সম্মুখে হঠাৎ দেখতে পেলেন সেই পদ্ম। কিন্তু তা তিনি স্পর্শও করলেন না। বললেন, “ওই পদ্ম মনসায় জন্ম নিয়েছে। ও-পদ্ম ছুঁলে আমার অধর্ম।” তখন জগদ্ধাত্রী কমলার মনে দয়া হল। তিনি কলাগাছ কেটে ভেলা বানিয়ে দিলেন চাঁদকে। সেই ভেলায় চড়ে তটে ফিরলেন চাঁদ। ফিরেই ‘শিব শিব’ বলে সাতবার প্রণাম ঠুকলেন তাঁর ইষ্টদেবতা মহাদেবকে।
কিন্তু লজ্জা আর ভয়ে অভিভূত উলঙ্গ চাঁদ সদাগর বসে রইলেন জলেই। আর তাই দেখে নেতা ধোপানি মনসাকে বললেন, “মাগো, চাঁদ জানে না তুমি কে। এবার তার প্রাণ তুমি রক্ষা করো।”

সূত্রঃ
১. উইকিপিডিয়া
২. ড. সৌমিত্র শেখর, বাংলা দর্পন।

Monday, January 25, 2010

অন্নদামঙ্গল কাব্য

১.
আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে।

২.
নগর পুড়িলে কি দেবালয় এড়ায়।

৩.
মন্ত্রের সাধন কিংবা শরীর পাতন।

৪.
বড়র পিরীতি বালির বাঁধ,
ক্ষনে হাতে দড়ি ক্ষনেকে চাঁদ।

৫.
অতি বড় বৃদ্ধ পতি সিদ্ধিতে নিপুণ,
কোন গুন নাই তার কপালে আগুন।

৬.
না রবে প্রাসাদ গুন নাহবে রসাল,
অতএব কহি ভাষা যাবনী মিশান।

উপরের জনপ্রিয় উদ্ধৃতিগুলো কম বেশি আমরা সবাই জানি। এই উদ্ধৃতিগুলো মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের অমর সৃষ্টি মঙ্গল কাব্যধারার ‘অন্নদামঙ্গল কাব্য’ থেকে নেওয়া। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ কবি, নাগরিক কবি ভারতচন্দ্রঁ রায়গুনাকরের অসাধারন শিল্পকর্ম এই অন্নদামঙ্গল কাব্য।

মঙ্গল কাব্যের প্রেক্ষাপট
আবহমানকাল থেকেই বাংলাদেশ একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের দেশ। নদীনালা, খালবিল, অরণ্য, জলাভূমিতে ভরা। ঝড়ঝঞ্ঝা, বন্যা, খরা, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, নদী ভাঙন ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ; বাঘ, কুমীর, সাপ ইত্যাদী হিংস্র জন্তু; কলেরা, বসন্ত, কালাজ্বর ইত্যাদি ভয়ঙ্কর রোগ ব্যাধি এদেশের অদিবাসীদের প্রায়ই মৃত্যুকবলিত করত। এই সমস্ত প্রতিকারহীন অদৃশ্য উপদ্রবের কাছে তারা নিজেদেরকে বড় অসহায় মনে করতে লাগল। তারা ভীত হয়ে ভাবল, এই সমস্ত উপদ্রব ঘটানোর ক্ষমতা নিশ্চয়ই অদ্ভুত ক্ষমতাধর কারে হাতে রয়েছে, এই অদ্ভুত ক্ষমতাধরর্টিকেই তারা দেবতারূপে কল্পনা করল। তারা ধরে নিল, এক একজন দেবতা বা দেবী এক একটি উপদ্রব ঘটায়। সাপের ক্ষেত্রে সর্পদেবী মনসা, ঝড় ঝঞ্ঝার ক্ষেত্রে চন্ডী দেবী, বাঘের ক্ষেত্রে দক্ষিণা রায়, ওলাউঠা বসন্তের ক্ষেত্রে দেবী শীতলা ইত্যাদী এইরূপ নানা দেব দেবীর উত্থান হল। এই দেব দেবীদের সন্তুষ্ট রাখতে, এঁদের মাহাত্ন্য কথা মুখে মুখে তৈরী করে গাওয়া হত। এভাবেই মঙ্গল কাব্যের সৃষ্টি। দেব দেবীর মাহাত্ন্য বর্ণানামূলক কাব্যই মঙ্গলকাব্য। শাস্ত্রকারদের মতে, যে কাব্য পাঠ করলে ও শ্রবণ করলে, এমনকি গৃহে রাখলেও গৃহস্থের সব অকল্যাণ দূর হয় এবং মঙ্গল হয়, তাই মঙ্গল কাব্য।

মঙ্গল কাব্যের ধারা
মঙ্গল কাব্যের প্রধান তিনটি ধারা দেখা যায়, মনসামঙ্গল, চণ্ডীমঙ্গল ও ধর্মমঙ্গল।
সর্পদেবী মনসার মাহাত্ন্যকথা মনসামঙ্গল কাব্যের উপজীব্য বিষয়। মনসামঙ্গলের প্রায় শতাধিক কবির নাম পাওয়া যায়। এঁদের মধ্যে কানাহরি দত্ত, বিজয় গুপ্ত, নারায়ন দেব, বিপ্রদাস পিপিলাই, দ্বিজ বংশীদাস ও কেতকদাস ক্ষেমানন্দ সমধিক পরিচিত।
দেবী চণ্ডীর মাহাত্ন্যকথা চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের উপজীব্য বিষয়। দেবী চণ্ডীর বিভিন্ন নাম আছে। দূর্গা, সারদা, অন্নদা ইত্যাদি। তাই অন্নদামঙ্গল ও সারদামঙ্গল কাব্য চণ্ডীমঙ্গলধারাভুক্ত, পৃথক কোন ধারা নয়। কবি মানিক দত্ত, কবিকঙ্কণ মুকুন্দরাম, দ্বিজ মাধব, ভারতচন্দ্র রায়গুনাকর চণ্ডীমঙ্গলধারার প্রধানকবি।
ধর্মঠাকুরের মাহাত্ন্যকথা ধর্মমঙ্গল কাব্যের উপজীব্য বিষয়। রামাই পন্ডিতের ‘শুন্যপুরান’ ও ময়ূর ভট্টের ‘হাকন্দপুরান’ ধর্মমঙ্গলধারার দুটি বিখ্যাত কাব্য।ময়ূরভট্ট, রামাই পন্ডিত, মানিকরাম গাঙ্গুলী, রূপরাম চক্রবর্তী ধর্মমঙ্গলকাব্যধারার প্রধানকবি।

ভারতচন্দ্র রায়গুনাকর
ভারতচন্দ্র ১৭১২ খ্রিস্টাব্দে পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া জেলার পাণ্ডুয়া গ্রামে এক জমিদার বংশে জন্ম গ্রহন করেন। তাঁর পিতা নারায়নচন্দ্র রায় ও মাতা ভবানী দেবী। ভারতচন্দ্র নবদ্বীপের রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সভাকবি ছিলেন। তিঁনি বাংলা, সংস্কৃত, হিন্দি, পারসি ও আরবী ভাষা জানতেন। ‘অন্নদামঙ্গল’ ছাড়াও তিঁনি ‘সত্য পীরের পাঁচালী’ নামক আরো একটি বিখ্যাত গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তিঁনি ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যু বরণ করেন।

অন্নদামঙ্গল কাব্য
‘অন্নদামঙ্গল’ ভারতচন্দ্র রায়গুনাকরের সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি।নবদ্বীপের রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের পৃষ্ঠপোষকতায় ১৭৫২ খ্রিস্টাব্দে এটি রচিত হয়। অন্নদামঙ্গল্ কাব্য তিনটি খন্ডে বিভক্ত। প্রথম খন্ড ‘অন্নদামঙ্গল’; দ্বিতীয় খন্ড ‘বিদ্যাসুন্দর’ ও তৃতীয় খন্ড ‘মানসিংহ’।
প্রথম খন্ডে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার নবাব আলিবর্দি কর্তৃক ভারতচন্দ্র রায়গুনাকরের পৃষ্ঠপোষক রাজা কৃষ্ণচন্দ্রকে কারাগারে নিক্ষেপ এবং কৃষ্ণচন্দ্র কর্তৃক অন্নপূর্ণাদেবীর পূজা করে বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়ার কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে।
দ্বিতীয় খন্ডে মোঘল সেনাপতি মানসিংহের বাংলায় আগমন ও বর্ধমানে সুন্দর কর্তৃক তৈরী সুড়ঙ্গ দর্শন কাহিনী বর্ণনা আছে। এ অংশ সংস্কৃতকাব্য ‘চৌরপঞ্চাশৎ’ অবলম্বনে রচিত হলেও বিদ্যা ও সুন্দরের প্রণয়কাহিনী রচনায় ভারতচন্দ্রের কৃতিত্ব উল্লেখযোগ্য।
তৃতীয় খন্ডে মোঘল সেনাপতি মানসিংহ ভবানন্দ মজুমদারের সহায়তায় যশোররাজ প্রতাপাদিত্যকে বন্দি করে সম্রাট জাহাঙ্গীরের কাছে নেওয়ার জন্য দিল্লী রওনা দেন। সংগে ভবানন্দকেও নিয়ে যান পুরস্কার দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে।কিন্তু সম্রাট সমস্ত বিবরণ শুনে দেবী অন্নপূর্ণাকে কটাক্ষ করায় ভবানন্দ প্রতিবাদ করলে তাঁকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। এতে দেবীর অনুচর ভূতপ্রেত দিল্লী শহর তছনছ করে দেয়। তখন বাধ্য হয়ে সম্রাট জাহাঙ্গীর ভবানন্দকে মুক্তি দিয়ে প্রচুর উপঢৌকন ও ‘রাজা’ উপাধী দিলেন এবং দেবী অন্নদার পূজা করে বিপদ থেকে মুক্ত হলেন। ভবানন্দ দিল্লী থেকে ফিরে ঘটাকরে দেবী অন্নপূর্ণার পূজা প্রচার করে পরিশেষে স্বর্গারোহণ করলেন। এখানেই তৃতীয় খন্ডের মঙ্গলকাব্যের সমাপ্তি।

সূত্রঃ ড. সৌমিত্র শেখর, বাংলা দর্পন।


পূর্বের পর্বঃ
চর্যাপদ